মঈন ইউকে রাষ্ট্রপতি বানাতে চায় ভারত, বেকে বসে আমেরিকা

ওয়ান ইলেভেনের পর যখন বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা সংসদ ভবনের বিশেষ কারাগারে বন্দি, তখন রাষ্ট্রপতি হবার তোড়জোড় শুরু করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ। ভারত তার পাশে দাঁড়ায়, কিন্তু বেকে বসে যুক্তরাষ্ট্র।
পল্টন থানার একটি মামলায় ৫ দিনের রিমান্ডে ডিবি পুলিশের কাছে এমন তথ্য দিয়েছেন পল্টন থানার মানবপাচার মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ৫ দিনের রিমান্ডে থাকা ওয়ান ইলেভেনের আলোচিত সেনাকর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দীন চৌধুরী। সম্প্রতি তাকে রাজধানীর ডিওএসএইচের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে গোয়েন্দা পুলিশ। আদালতের আদেশে মাসুদ বর্তমানে ডিবি হেফাজতে আছেন।
জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম দিনে মুখ না খুললেও দ্বিতীয় দিনে মাসুদ জিজ্ঞাসাবাদকারীদের বলেন, সে সময়ে ভারত সফরে গেলে মঈনকে রাষ্ট্রপতির প্রটোকল হিসেবে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। কোনো সেনাপ্রধান রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুযায়ী এ ধরনের গালিচা পান না। মঈনকে স্বাগত জানানোর জন্য ভারত এমন রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুসরণ করে যা সাধারণত কোনো রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া হয়ে থাকে।
তবে ভারতের এ আয়োজনের খবর পেয়ে বাধা দেয় প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র। আর বাংলাদেশের সেনা কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশও এর বিরোধিতা করে। স্ববাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরোধিতার মুখে ভোটের আয়োজন করা হয় সেনাবাহিনীর ভেতরে। জেনারেলরা ছিলেন ভোটার। বেশিরভাগ জেনারেল সেনাবাহিনীর রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণের বিরুদ্ধে ভোট দেন এবং খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিয়ে সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার পক্ষে ভোট দেন।
এরপরেও সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ এসব জেনারেলদের ভোটের রায় কৌশলে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রপতি হয়ে বঙ্গভবনে বসে রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে রাখতে চাইলে ক্ষমতা ছাড়তে চাপ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে মুক্তি দিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে ভোটের ব্যবস্থা করতে কড়া চাপ দেয়।
গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রিমান্ডে থাকা সেনাকর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দীন চৌধুরী এসব কথা জানিয়েছেন বলে জিজ্ঞাসাবাদকারীদের একটি সূত্র ভিওডি বাংলাকে জানিয়েছেন।
গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, মাসুদ উদ্দিন অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া জিজ্ঞাসাবাদ সামলানোর যে প্রশিক্ষণ মাসুদ উদ্দিনের পদমর্যাদার সেনাকর্মকর্তারা নিয়ে থাকেন, সেই কৌশলও খাটাচ্ছেন তিনি। নানান উত্তর এড়াতে রিমান্ডে মাসুদ অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে কথা বলছেন। সতর্কতার সঙ্গে উত্তর দিচ্ছেন এবং নিজেকে জড়িয়ে কোনো অপরাধই স্বীকার করতে চাচ্ছেন না। মঈন ইউ আহমেদের সঙ্গে নানা মতপার্থক্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে জানিয়ে কিছু প্রসঙ্গ অন্ধকারে ঢেকে রাখতে চাচ্ছেন মাসুদ।
তিনি মঈন ইউর রাষ্ট্রপতি হতে চাওয়ার কথা স্বীকার করলেও নিজে তিনি প্রধানমন্ত্রী বা সেনাপ্রধান হতে চেয়েছিলেন বলে যে কথা মঈনবিরোধী জেনারেলদের মুখে শোনা যাচ্ছিল, সেই বিষয়টি স্পষ্ট করছেন না মাসুদ।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী পুলিশকে বলেছেন, মঈন ইউ আহমেদ রাষ্ট্রপতি হয়ে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হতে চেয়েছিলেন। এ ব্যাপারে গোপনে তিনি নানা প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারেননি নানা কারণে। মঈন ইউ আহমেদের কারণে তাকে সেনাবাহিনী থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
সূত্র জানিয়েছে, এক-এগারো সরকারের কুশীলবদের অন্যতম ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতি-অনিয়ম দূর করতে গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করলে প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পান মাসুদ উদ্দিন। এতে তিনি অগাধ ক্ষমতাধরের অবস্থানে পৌঁছান। ওই সময় ক্ষমতার ভাগাভাগিসহ নানা ইস্যুতে সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। এর কারণে ২০০৮ সালের ৮ জুন তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। এরপর একই বছর ২ সেপ্টেম্বর তাকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর তিনি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে কার্যত সেনাবাহিনী থেকে তাকে বের করে দেন মঈন ইউ আহমেদ। এ বিষয়ে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গোয়েন্দা পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। কী কী বিষয় নিয়ে মঈন ইউ আহমেদের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়—এ বিষয়েও তথ্য দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
একাধিক সূত্র বলেছে, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের বছরখানেক পরই মঈন ইউ আহমেদকে ভারত সফরে আমন্ত্রণ জানায় নয়াদিল্লি। এরপর ২০০৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ছয় দিনের সফরে ভারতের নয়াদিল্লি যান তিনি। ওই সফরে সেনাপ্রধানের একমাত্র সফরসঙ্গী ছিলেন তৎকালীন স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমী। ওই সফরে তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রপ্রধানের প্রটোকলও দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে উপহার হিসেবে দেওয়া হয় জার্মান হ্যানোভারিয়ান জাতের ছয়টি ঘোড়া। এতে মঈন ইউ আহমেদের রাষ্ট্রপতি হওয়ার খবর আরও জোরালোভাবে প্রচারিত হয়। এ সফরে মঈন ইউ আহমেদের সঙ্গে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় এবং দেশটির সেনাপ্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বৈঠক হয়। যেসব বৈঠকে বেশ কিছু ইস্যুতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির অনেক কিছুর গতিপথ নির্ধারণ হয় বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। এসব বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/এমএস







