• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

৮শ’ টাকায় কি করে মাস পার করবে রোহিঙ্গারা?

রুদ্র রাসেল    ৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১০ পি.এম.
রোহিঙ্গাদের মাসিক সহায়তা কমানাের সিদ্ধান্ত। ছবি: কোলাজ

বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর খাদ্য সহায়তা নতুনভাবে কমিয়ে দেয়া হয়েছে। নতুন স্তরভিত্তিক ব্যবস্থা অনুযায়ী শরণার্থীর জনপ্রতি মাসিক সহায়তা ১২ ডলার থেকে কমিয়ে ৭ ডলারে নেমে এসেছে। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

কিন্তু ৭ মার্কিন ডলার- যা বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশের মুদ্রায় ৮০০ টাকা বা সামান্য বেশি অংকের টাকা। যা দিয়ে পরিবারসহ তো দূরের কথা একজন মানুষের এক মাস খাবার খরচ চালানো অসম্ভব বাংলাদেশের নিত্যপণ্যের বাজার দর অনুযায়ী। 

একাধিক বাজারের দর যাচাই, বাজার দর যাচাই ও ক্রেতাদের সঙ্গে আলাপ করে পাওয়া তথ্য এবং পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য সমন্বয়ে পাওয়া সারবস্তু হচ্ছে- বাংলাদেশে একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির স্বাস্থ্যের জন্য দৈনিক প্রায় ২,২০০–২,৪০০ ক্যালোরি খাবার প্রয়োজন বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন। 

ঢাকার মতো বড় শহরে এই ক্যালোরি মেটাতে প্রয়োজনীয় খাদ্যের খরচ দিনে প্রায় ৪১৮–৬৩৩ টাকা এবং মাসে প্রায় ১২,৯০০–১৯,৬০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, যেখানে চাল, ডাল, সবজি, প্রোটিন জাতীয় খাবার এবং তেল-মশলা অন্তর্ভুক্ত। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যেমন গ্রামীণ এলাকায় এই খরচ কিছুটা কমে মাসে ৯,৮০০–১৪,৩০০ টাকা পর্যন্ত নেমে আসে। শিশু ও বয়স্কদের জন্য দৈনিক ক্যালোরি প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম হলেও, পুষ্টিকর খাদ্য উপাদান যেমন দুধ, ডিম এবং শাকসবজি যুক্ত করলে খরচ প্রায় সমান বা সামান্য কম হতে পারে। 

গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের জন্য ন্যূনতম ব্যয় প্রায় প্রতিদিন ৮৩ টাকা, বা মাসে প্রায় ২,৫৭০ টাকা, যেখানে ক্যালোরি এবং পুষ্টির প্রয়োজনীয়তা পূর্ণ হয়। এই হিসাব অনুযায়ী, রোহিঙ্গা শিবিরে যেখানে জনপ্রতি খাদ্য সহায়তা মাত্র প্রায় ৮২৩ টাকা বা ৭ ডলার, সেখানে বাস্তব ন্যূনতম খাবারের খরচের সঙ্গে বড় ফারাক রয়েছে এবং এটি শিবিরবাসীদের দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।

খাদ্য সহায়তায় আর্থিক বরাদ্দ কমানোর বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ভিওডি বাংলাকে বলেন, খাদ্য সহায়তা কমে গেলে ক্যাম্পে হতাশা বৃদ্ধি পাবে এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে পারে। শরণার্থীরা খাদ্য ও জীবিকার অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে।

রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নৃশংস অভিযানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। তারা বাংলাদেশে আইনত কাজ করতে পারেন না এবং মূলত আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা সীমিত, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন অপর্যাপ্ত এবং শিক্ষার সুযোগ নগণ্য। এসব কারণে শরণার্থীদের জীবনযাত্রা দীর্ঘদিন ধরে সংকটাপন্ন।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) থেকে জানা গেছে, নতুন রেশনব্যবস্থা ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য করা হয়েছে। তবে বাস্তবে ৭ ডলারে পুরো মাসের খাবার চালানো শরণার্থীদের কাছে প্রায় অসম্ভব মনে হচ্ছে। শিবিরের বাসিন্দা মোহাম্মদ রাহিম বলেছেন, “৭ ডলারে আমাদের তিন সন্তানকে খাওয়ানো কি সম্ভব? আমাদের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

তিনি জানান, আগের রেশন ১২ ডলার থাকাকালেও পরিবারের খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে অসুবিধা হতো। 

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরাও সতর্ক করেছেন, খাদ্য কমে গেলে শিশুদের অপুষ্টি, অসুস্থতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা, মানবপাচার এবং বাল্যবিবাহের ঝুঁকি একাধিক শরণার্থীর জন্য জীবন-হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

আন্তর্জাতিক মিডিয়া রয়টার্স জানিয়েছে, বৈশ্বিক সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালে সহায়তা কার্যক্রমের অর্থায়ন ছিল অর্ধেক, ২০২৬ সালে তা কমে এসেছে মাত্র ১৯ শতাংশে। ২০২৩ সালে অর্থসংকটে রেশন কমিয়ে ৮ ডলার করা হয়েছিল। 

ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় ন্যূনতম ২,১০০ ক্যালোরি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।

শরণার্থীদের জন্য শিক্ষাসহ অন্যান্য মানবিক সহায়তাও সীমিত হচ্ছে। 

আন্তর্জাতিক শিশু সংস্থা সেইভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, সহায়তা কমে যাওয়ায় বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম এবং অপুষ্টির হার বেড়ে গেছে। ২০২৫ সালে ক্যাম্পের প্রায় ১৫ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করছে।

শরণার্থীরা ইতোমধ্যেই সহিংসতা এবং মানবপাচারের ঝুঁকি নিয়ে শিবির ছাড়ার পরিকল্পনা করছে। অনেকে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে, আবার কেউ কেউ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা করতে চাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “অপরিকল্পিত খাদ্য সহায়তা কমানো মানুষের জীবন-জীবিকা এবং নিরাপত্তার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। এটি মানবিক ও নৈতিক সংকট।”

মানবিক সহায়তা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট আরও গভীর হবে। ডব্লিউএফপি এবং অন্যান্য সংস্থা ক্ষুধা ও অপুষ্টি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।

ভিওডি বাংলা/আরআর/আ

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ইলিয়াস আলী গুমের পেছনে ভারত, নির্দেশ হাসিনার বাস্তবায়নে জিয়াউল
ইলিয়াস আলী গুমের পেছনে ভারত, নির্দেশ হাসিনার বাস্তবায়নে জিয়াউল
দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম মাসে কি করলেন প্রশাসক? জানালেন নিজেই
দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম মাসে কি করলেন প্রশাসক? জানালেন নিজেই
ফেঁসে যাচ্ছে এস আলম বসুন্ধরাসহ ৮ শিল্পগ্রুপ
ফেঁসে যাচ্ছে এস আলম বসুন্ধরাসহ ৮ শিল্পগ্রুপ