এক কার্ডে কড়াইল বস্তিতে স্বস্তি ও আশার আলো

রাজধানীর গুলশান-বনানীর পাশেই অবস্থিত কড়াইল বস্তি-ঘনবসতি, সংকীর্ণ গলি আর সীমাহীন সংগ্রামের এক বাস্তব চিত্র। এখানে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষই নিম্নআয়ের; কেউ গৃহকর্মী, কেউ রিকশাচালক, কেউ বা দিনমজুর। প্রতিদিনের আয়েই চলে সংসার, আর সেই আয় দিয়ে মাসের শেষে টিকে থাকাই যেখানে চ্যালেঞ্জ, সেখানে সঞ্চয় তো দূরের কথা।
এই বাস্তবতায় হঠাৎ করেই যেন আশার আলো হয়ে এসেছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’। প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা-যা অনেকের জীবন হিসাব বদলে দিয়েছে একেবারেই।
স্বস্তি ফিরেছে সংসারে:
কড়াইল বস্তির বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই অর্থ তাদের জন্য শুধু টাকা নয়—বরং দুশ্চিন্তা কমার একটি বড় অবলম্বন। কেউ এই টাকায় ঘরভাড়া দিচ্ছেন, কেউ বাজার করছেন, কেউ সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন।
রংপুরের কুড়িগ্রাম থেকে আসা গৃহকর্মী সাবিনা বলেন, স্বামীর অল্প আয়ে সংসার চালানো ছিল খুবই কষ্টকর। এখন অন্তত ঘরভাড়া নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। তার ভাষায়, “ঘরভাড়া দেওনের চিন্তা থেইকা বাঁচছি।”
শিক্ষার্থীদের জন্য আশীর্বাদ:
মিম আক্তার, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ শিক্ষার্থী। তার মায়ের নামে পাওয়া এই সহায়তা এখন তার পড়াশোনার সহায়ক। তিনি জানান, “এই টাকায় আমার ভার্সিটির বেতন আর যাতায়াত খরচ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের মতো পরিবারের জন্য এটা অনেক বড় সহায়তা।
চিকিৎসা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ও সহায়তা:
শুধু দৈনন্দিন খরচ নয়, এই অর্থ কাজে লাগছে চিকিৎসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোগেও। কামরুন্নাহার তার ছেলের চিকিৎসায় এই টাকা ব্যবহার করেছেন। আবার সাহিদা আক্তার তার সন্তানের ছোট দোকানে চা-বিস্কুট তোলার জন্য এই টাকা দিয়েছেন।

ঈদে বাড়তি আনন্দ:
এবারের ঈদুল ফিতর কড়াইল বস্তির মানুষের জন্য ছিল কিছুটা ভিন্ন। ঈদের আগে পাওয়া এই সহায়তা অনেকের ঘরে এনেছে বাড়তি আনন্দ। কেউ নতুন কাপড় কিনেছেন, কেউ ভালো খাবারের আয়োজন করেছেন-যা আগে কল্পনাও করা কঠিন ছিল।
দীর্ঘদিনের বঞ্চনার পর প্রাপ্তি:
বস্তির অনেকেই জানিয়েছেন, অতীতে তেমন কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। তাই এই উদ্যোগ তাদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ষাটোর্ধ্ব বিউটি বলেন, “এতদিন পরে এমন সাহায্য পেয়ে অনেক উপকার হইছে।
স্বপ্ন দেখার শুরু:
এই সহায়তা শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের স্বপ্নও জাগাচ্ছে। কেউ ভাবছেন জমি কিনবেন, কেউ চান সন্তানদের ভালোভাবে পড়াতে। সামিরণ বেগম বলেন, “কয়েক মাস জমাইলে গ্রামে একটা জায়গা কিনে ঘর করমু।
কর্মসূচির বিস্তৃতি:
প্রথম পর্যায়ে কড়াইল বস্তিতে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্রদের নির্বাচন করা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, এটি একটি পাইলট প্রকল্প-পর্যায়ক্রমে দেশের আরও কোটি পরিবারকে এর আওতায় আনা হবে।
বাস্তবতার ভেতর আশার গল্প:
কড়াইল বস্তি যেন এক বিচ্ছিন্ন জগত-এক পাশে আকাশচুম্বী ভবন, অন্য পাশে টিনের ঘর। কিন্তু এই বৈপরীত্যের মাঝেই এখন জন্ম নিচ্ছে নতুন আশার গল্প।
একটি কার্ড, মাত্র আড়াই হাজার টাকা-কিন্তু সেই টাকাই বদলে দিচ্ছে বহু মানুষের জীবনের হিসাব। দুশ্চিন্তার ভার কমিয়ে এনে দিচ্ছে স্বস্তি, আর অনিশ্চয়তার জায়গায় তৈরি করছে ছোট ছোট স্বপ্নের ভিত্তি।
ভিওডি বাংলা/জা







