আজ শুরু হচ্ছে রথযাত্রা

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠান শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসব শুরু হচ্ছে আজ।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকাল ৮টায় রাজধানীর স্বামীবাগ মন্দিরে বিশ্বশান্তি ও মঙ্গল কামনায় অগ্নিহোত্র যজ্ঞের মধ্য দিয়ে রথযাত্রা মহোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। পরে বেলা ৩টায় মন্দির থেকে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা বের হবে। সন্ধ্যা ৭টার দিকে রথ ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পৌঁছাবে।
জানা যায়, রাজধানীর স্বামীবাগ আশ্রম থেকে রথযাত্রা শুরু হয়ে জয়কালী মন্দির, ইত্তেফাক মোড়, শাপলা চত্বর, দৈনিক বাংলার মোড়, পল্টন মোড়, জাতীয় প্রেস ক্লাব, হাইকোর্ট, দোয়েল চত্বর, শহীদ মিনার ও পলাশীর মোড় হয়ে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে গিয়ে শেষ হবে। পরে ২৫ জুলাই বিকেলে একই পথে উল্টো রথের শোভাযাত্রা ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে স্বামীবাগ আশ্রমে ফিরে আসবে।
সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে রথযাত্রায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। পুলিশসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন। এ ছাড়া ৫০০ স্বেচ্ছাসেবক শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকবেন।
রথযাত্রা উপলক্ষে আয়োজিত ৯ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় রয়েছে, হরিনাম সংকীর্তন, বিশ্ব শান্তি ও মঙ্গল কামনায় অগ্নিহোত্র যজ্ঞ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আলোচনাসভা, শোভাযাত্রা, পদাবলী কীর্তন, আরতি কীর্তন, ভগবত কথা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শ্রীমদ্ভাগবত গীতা পাঠ, ধর্মীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও ধর্মীয় নাটক মঞ্চায়ন।
এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন মন্দিরে বিশেষ পূজা-অর্চনা, গীতাপাঠ, ধর্মীয় আলোচনা, কীর্তন, প্রসাদ বিতরণ, ভক্তদের অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দিরে সকাল থেকেই ভক্তদের সমাগম ঘটবে। এছাড়া চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানীয়ভাবে রথযাত্রা উপলক্ষে বিশেষ কর্মসূচি পালিত হবে।
রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানই নয়; এটি সম্প্রীতি, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং মানবকল্যাণের বার্তা বহন করে। বিভিন্ন বয়সী মানুষ এই উৎসবে অংশ নিয়ে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক ঐক্যের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করেন।
প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, প্রায় ৪০০ বছর আগে ধামরাইয়ের জমিদার শ্রী যশোপাল একদিন সৈন্য-সামন্ত নিয়ে যাওয়ার পথে একটি ঢিবির সামনে এসে তার হাতি থেমে যায়। পরে ঢিবি খনন করে একটি মন্দির ও কয়েকটি দেবমূর্তি পাওয়া যায়। সেগুলো বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর রাতে স্বপ্নে মাধব দেবতার নির্দেশ পান তিনি। এরপর নিজের নামের সঙ্গে ‘মাধব’ যুক্ত করে যশোমাধব নাম গ্রহণ করেন এবং ওই সময় থেকেই যশোমাধবের পূজা ও রথযাত্রার সূচনা হয়। সেই ঐতিহ্য আজও চলে আসছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলা ১২০৪ থেকে ১৩৪৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সাটুরিয়ার বালিয়াটির জমিদাররা বংশানুক্রমে এখানে চারটি রথ নির্মাণ করেন। ১৩৪৪ খ্রিষ্টাব্দে নারায়ণগঞ্জের স্বর্গীয় সূর্যনারায়ণ সাহার তত্ত্বাবধানে এক বছর সময় নিয়ে একটি রথ নির্মিত হয়। ধামরাই, কালিয়াকৈর, সাটুরিয়া ও সিঙ্গাইরের কাঠশিল্পীরা যৌথভাবে ৬০ ফুট উচ্চতার ত্রিতলবিশিষ্ট রথটি নির্মাণ করেছিলেন। পরে বালিয়াটির জমিদাররা এলাকা ছেড়ে গেলে রথের দেখভালের দায়িত্ব নেয় টাঙ্গাইলের রণদাপ্রসাদ সাহার পরিবার।
২০১০ সালে পুরোনো রথের আদলে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রথ নির্মাণ করা হয়। প্রায় ৪০ জন শিল্পী ছয় মাসের বেশি সময় ধরে কাজ করে ৩৭ ফুট উচ্চতা ও ২০ ফুট প্রস্থের কারুকার্যমণ্ডিত রথটি তৈরি করেন। লোহার কাঠামোর ওপর সেগুন ও চাম্বল কাঠ বসিয়ে খোদাই করা এ রথে রয়েছে ১৫টি লোহার চাকা। সামনে রয়েছে কাঠের তৈরি দুটি ঘোড়া ও একজন সারথির অবয়ব। বিভিন্ন স্তরে স্থাপন করা হয়েছে কাঠের তৈরি দেব-দেবীর মূর্তি।
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ও শোভাযাত্রার রুটে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আয়োজকরাও ভক্তদের নির্বিঘ্নে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন।
বাংলাদেশে প্রতিবছর রথযাত্রাকে ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি অনেক এলাকায় মেলা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়, যা সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়।
ভিওডি বাংলা/বিন্দু








মন্তব্য