যেভাবে আগুন লাগে ব্যাংককের সেই বারে

ব্যাংককের একটি ভিড়ঠাসা বারে গান গাইছিল থাইল্যান্ডের ব্যান্ড থোটসাকান। তখন কি–বোর্ড বাদকের পেছন থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখেন মঞ্চের বাইরে বসা ব্যান্ডের ব্যবস্থাপক আইস আথিপাত উইজার্ন।
কি–বোর্ড বাদক কোয়াং সবাইকে বাইরে বের হতে চিৎকার করে ওঠেন এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শহরের চাতুচাক এলাকার ‘রং বিয়ার না লাট ফরাও’ নামের ওই পানশালায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে।
ধোঁয়ায় পুরোপুরি ঢেকে যাওয়া ঘরটি থেকে বের হওয়ার চেষ্টাকালে দরজা হাতড়ে বেড়ানোর কথা স্মরণ করেন আইস।
থাইল্যান্ডের একটি টক শোতে আইস বলেন, ‘সবাই দৌড়াচ্ছিল, একে অপরকে চিড়েচ্যাপটা করছিল।’ তিনি হামাগুড়ি দিয়ে বের হওয়ার দরজার দিকে এগোচ্ছিলেন। তখনই কিছু একটা বিস্ফোরিত হয়। তিনি পানশালার বাইরে ছিটকে পড়েন।
বার্তা সংস্থা এএফপিকে আইস বলেন, ‘আমার প্রেমিকার মরদেহ বের করে আনার দৃশ্য, আগুনে পুড়ে যাওয়া আমার বন্ধুর দৃশ্য এবং সেখানে যা যা ঘটেছে, তা এখনো আমার মনে গেঁথে আছে।’
সোমবার (১৩ জুলাই) কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, এ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন কয়েক ডজন মানুষ।
ব্যান্ডের আরেক সদস্য পাচারা সংফাতকায়েউ ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, আহত অবস্থায় কি–বোর্ড বাদক কোয়াং, নারী কণ্ঠশিল্পী ব্রিজ ও ড্রামার বিউ মারা গেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি পোস্টে পাচারা লিখেছেন, ডিন নিখোঁজ ছিলেন। পরে গতকাল সন্ধ্যায় তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থা কেমন, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
থাই গণমাধ্যম জানিয়েছে, আগুন লাগার ঠিক আগমুহূর্তে মূল গায়ক টিক চাইচানা বাথরুমে গিয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি অক্ষত অবস্থায় প্রাণে বেঁচে যান। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, জ্বলন্ত পানশালা থেকে দৌড়ে বের হওয়ার সময় তিনি হাউমাউ করে কাঁদছেন।
ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে টিক লিখেছেন, ‘আমি নিরাপদে আছি। খোঁজ নেওয়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। তবে আমার ফোন এবং সব জিনিসপত্র পুড়ে গেছে...আমার মনের অবস্থা এখন একেবারেই ভালো নেই।’
ওই রাস্তার অন্যান্য বারের মতো রং বিয়ার না লাট ফরাও বারটিও স্থানীয় লোকজনের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র একজন বিদেশিকে শনাক্ত করা গেছে। তিনি লাওসের নাগরিক।
ইন্টারনেটে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, আতঙ্কিত গ্রাহকেরা চিৎকার করতে করতে সামনের জ্বলন্ত দরজা দিয়ে পালাচ্ছেন। এ সময় কয়েকজনের পোশাকেও আগুন জ্বলতে দেখা যায়।
৪১ বছর বয়সী উসা তাদশ্রী রয়টার্সকে বলেন, ‘একটি বিকট শব্দ—হঠাৎ খুব দ্রুত একটি বিকট শব্দ হলো...সেখান থেকে বের হওয়ার আর কোনো উপায় ছিল না।’ তিনি আরও বলেন, এই আগুনে তাঁর দুই বন্ধু মারা গেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভেতরে আটকে পড়া বন্ধুদের বাঁচাতে বারের ভেতর ঢোকার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন অনেকে।
কেওউদোন পংপানি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি মানুষের চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি আমার ভাইকে সাহায্য করতে ভেতরে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ঢুকতে পারিনি। সেখানে শুধু ধোঁয়া, ধুলা আর প্রচণ্ড তাপ ছিল।’
থাই কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ঘটনায় অন্তত ৭১ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
আগুনের ভয়াবহতা দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন বলে জানান ওই এলাকার বেশ কয়েকজন বাসিন্দা।
বারের রাস্তার উল্টো দিকে থাকেন টিটি লিউচা। তিনি বলেন, ‘আমি দেখলাম ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রায় সব জায়গার আগুন নেভানোর চেষ্টা করছিলেন।’
লিউচা বলেন, ‘সব জায়গায় শুধু অ্যাম্বুলেন্স আর উদ্ধারকারী গাড়ি দেখছিলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম না কী করব। শুধু কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে বসেছিলাম।’
লিউচা ও তাঁর প্রতিবেশী সিরিনিয়া বিবিসি থাইকে বলেন, প্রথমে তাঁরা ভয় পাচ্ছিলেন, আগুন হয়তো তাঁদের বাড়ির দিকেও ছড়িয়ে পড়বে।
সিরিনিয়া বলেন, ‘জীবনে এই প্রথম এত বড় আগুন দেখলাম আমি।’
ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন।
সিরিনিয়া চিন্তিত যে এমন মর্মান্তিক ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। কারণ, ওই এলাকায় এ ধরনের অনেক বার রয়েছে।
সিরিনিয়া আগে একবার ওই বারে গিয়েছিলেন। সেই কথা মনে করে তিনি বলেন, জায়গাটি ছিল ‘খুবই অন্ধকার এবং ছাদ ছিল বেশ নিচু’।
সিরিনিয়া আরও বলেন, আগুন লাগলে বের হওয়ার পথগুলো পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় না।
ফাতসারা খামলোয়েট, যিনি মে মাসে পাবটি পরিদর্শন করেছিলেন, তিনিও (এর) অন্ধকার এবং ‘গোলকধাঁধার মতো’ পরিবেশ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন।
ফাতসারা বলেন, ‘কাচের কারণে মনে হচ্ছিল, এটি বন্ধ। ভেতরটা এত অন্ধকার ছিল যে কিছু দেখাই যাচ্ছিল না।’
ফাতসারা বলেন, বাথরুমে যাওয়ার জন্য তাঁকে একটি ‘আঁকাবাঁকা পথ’ পার হতে হয়েছিল। বের হওয়ার পথগুলোতেও কোনো দিকনির্দেশনা দেওয়া ছিল না।
ফাতসারা আরও বলেন, ‘ভেতরে পা রাখার পরপরই আমার প্রথম মনে হয়েছিল, ‘আরে, যদি আগুন লাগে, তবে আমরা কীভাবে বের হব?’
এর আগে গতকাল ব্যাংককের গভর্নর চাটচার্ট সিত্তিপুন্ত জানান, বারের ছাদে এমন কিছু দিয়ে সাজানো ছিল, যাতে সহজেই আগুন ধরতে পারে। সম্ভবত এ কারণেই আগুন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
চাটচার্ট আরও বলেন, ভবনের বের হওয়ার জরুরি দরজার কাছে কয়েকজনকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মানে হলো পালানোর পথে হয়তো কোনো বাধা ছিল। তবে তিনি স্বীকার করেন, এসব বিষয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটি সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন।
এ মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের পর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের দাবি আবারও সামনে এসেছে। বিশেষ করে রাতের বিনোদনশিল্পে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের সঠিক প্রশিক্ষণের দাবি জোরদার হয়েছে।
বারের কাছে কাজ করেন এমন একজন গাড়িচালক পরামর্শ দেন, বারের মালিকদের উচিত নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়া করা, যাতে কর্মীরা জরুরি অবস্থায় নিরাপদে বের হওয়ার নিয়মগুলো সম্পর্কে জানতে পারেন।
গাড়িচালক বলেন, অথবা যখন এ ধরনের কোনো জায়গার নকশা করা হয়, তখন দরজাগুলো আরও চওড়া করা উচিত। দরজা বড় হলে গ্রাহকদের পক্ষে বের হওয়া সহজ হবে।
গাড়িচালক আরও বলেন, ‘যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে, দুঃখ হচ্ছে। কারণ, তাঁরা হয়তো বুঝতেই পারেননি যে কী ঘটতে যাচ্ছে।’
ভিওডি বাংলা/এফএ








মন্তব্য