মামুন খালেদের রিমান্ড শুনানিতে আদালতে যা ঘটেছে

রাজধানীর মিরপুর থানায় দায়ের হওয়া ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতা হত্যা’র মামলায় ৫ দিনের রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বেলা দেড়টার দিকে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে আদালতে হাজির আনে পুলিশ। এরপর তাকে ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। দুপুর ২টার দিকে পুলিশ পাহাড়ায় তাকে এজলাসে তোলা হয়।
এসময় মামলার মূল রহস্য উদঘাটনের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন- কারণ দেখিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) কফিল উদ্দিন পুনরায়খিালেদ মামুনকে সাত দিন হেফাজতে চেয়ে আবেদন করেন।
শুনানির শুরুতে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি আদালতকে বলেন, 'এই আসামি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করেছেন। এর পুরস্কার হিসেবে তিনি ডিজিএফআইয়ের পরিচালক পদসহ নানা ব্যবসায়িক সুবিধা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। শেখ হাসিনার সব অপকর্মের সহযোগী হওয়ার কারণেই তাদের এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে আর কারা জড়িত তা উদ্ঘাটনে তাকে রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।'
শুনানীকালে কাঠগড়ায় খালেদ মামুন হাত উঁচু করে বিচারকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কথা বলার অনুমতি চান। বিচারক অনুমতি দিলে খালেদ মামুন বলেন, ‘আমি কমিউনিকেশন অফিসার হিসেবে কাজ করেছি। আমরা আর্মস ক্যারি করি না। আমার তিনটি পিএইচডি আছে, পাঁচটি মাস্টার্স আছে। আমার ২২ বছর লেগেছে অ্যাকাডেমিক এক্সিলেন্স অর্জন করতে। আমার পুরো জীবনটাই গেছে পড়াশোনার পেছনে। আমি যেসব স্টুডেন্ট পড়াই তাদের ওপর কীভাবে গুলি চালাতে নির্দেশ দেব? আমার ২৪ বছরের ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে গেছে। ২৪ বছরের সম্মান ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।'
যা বলা হয়েছে রিমাণ্ড আবেদনে:
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়- ‘বিগত দফার জিজ্ঞাসাবাদে আসামির কাছ থেকে ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে, যা মামলার তদন্ত কাজে বিশেষ সহায়ক হবে। আসামির দেওয়া তথ্যগুলো বর্তমানে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্তের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে শেখ মামুন খালেদকে পুনরায় ৭দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।’
দুই আইনজীবির যুক্তির যুদ্ধ:
রিমাণ্ড আবেদনের পক্ষে উপস্থাপিত যুক্তির বিপরীতে আসামিপক্ষের আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন রিমান্ড বাতিল ও জামিন চেয়ে শুনানি করেন। তিনি বলেন, 'মামুন খালেদ ৩০ অক্টোবর ২০২১ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। একজন ব্যক্তি অবসরে যাওয়ার পর তার কোনো আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার থাকে না।'
তিনি আরও দাবি করেন, 'এই মামলায় মামুন খালেদকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জড়ানো হয়েছে। মামলার এজাহারে বাদী তাকে আসামি করেননি, বরং তাকে এখানে সন্দিগ্ধ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ডের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শাতে পারেননি। তিনি দেশের ও জাতির জন্য কাজ করেছেন এবং সুনামের সাথে ডিফেন্সে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই তার রিমান্ড বাতিল করে জামিন দেওয়া হোক।'
এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী পুনরায় বলেন, 'তিনি (মামুন) শেখ হাসিনার জন্য কাজ করেছেন, যে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল। ফ্যাসিস্ট সরকারকে টিকিয়ে রাখতে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। অনেক যোগ্য অফিসারকে বঞ্চিত করে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি অবসরে যাওয়ার পরও তিনি হাসিনার হয়ে কাজ করেছেন।'
এর আগে, গত বৃহস্পতিবার (২৫ মার্চ) রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন আদালত তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে মিরপুর-১০ নম্বর ফলপট্টি এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে আন্দোলনে অংশ নেওয়া দেলোয়ার হোসেন গুরুতর আহত হন। প্রথমে তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে এবং পরে শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১ জুলাই সকালে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ৬ জুলাই নিহতের স্ত্রী মোছা. লিজা বাদী হয়ে মিরপুর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ভিওডি বাংলা/আরআর







