লোডশেডিং শঙ্কা
বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ

সরকার আশ্বস্থ করলেও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থার প্রভাবে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও মজুদ নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে জনমনে। এর প্রভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হয়ে লোডশেডিং ফিরে আসতে পারে- এমন ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে সাধারণ মানুষের আলোচনায়। এ অবস্খায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবিচ্ছিন্ন রাখাটা সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা নতুন সরকার উপলব্ধি করছে বলে সরকারের একাধিক মন্ত্রী ভিওডি বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার কারণে তেল আমদানি ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়েই জ্বালানি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে জ্বালানি ব্যবহৃত হওয়ায়- সেক্ষেত্রে দেশের জ্বালানি নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে ইতোমধ্যেই। তবুও লোডশেডিং নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছেই না নাগরিকদের।
এদিকে ইলেকট্রিক সামগ্রী বিক্রয়কারী পাইকারি ও খুচরা প্রতিষ্ঠানগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চার্জার ফ্যান, চার্জার লাইটসহ বিদ্যুৎ না থাকলেও বৈদ্যুতিক সুবিধা নিশ্চিত করে এমন সামগ্রীর বিক্রি ও চাহিদা ব্যাপক বেড়েছে। বিক্রেতারা সুনির্দিষ্টভাবে এসব সামগ্রী বিক্রি হওয়ার সংখ্যা বা টাকার পরিমান জানাতে না চাইলেও বিক্রি বেড়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন।
সরকারের একটি সূত্র বলছে, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওনা জমেছে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের তেলচালিত কেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। আদানির পর বকেয়া আদায়ে এখন চাপ দিচ্ছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকেরা। তারা বলছেন, বকেয়া না পেলে জ্বালানি কিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবেন না তারা। এ কারণে এবারের গ্রীষ্ম মৌসুমে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি হতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শীতের শেষে ফেব্রুয়ারিতেই বিদ্যুতের চাহিদা ১২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। গ্রীষ্মে চাহিদা সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়াতে পারে। দেশে উৎপাদন–সক্ষমতা আছে ২৮ হাজার মেগাওয়াট। তবু জ্বালানির (গ্যাস, কয়লা, ফার্নেস তেল) অভাবে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে।
পিডিবির দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়ায়নি, নতুন সরকারও এখন দাম বাড়াতে চায় না। তাই পিডিবির ঘাটতি পূরণে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে গ্রীষ্মে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা, দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার ও খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৩ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮ টাকা ৯৫ পয়সা।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখাটা যে বড় চ্যালেঞ্জ হবে, তা উপলব্ধি করছেন নতুন সরকার।
তিনি আরও বলেন, গ্যাসের অভাব আছে, জ্বালানির ঘাটতি আছে, বকেয়া আছে। সব মিলে একটা জটিল পরিস্থিতি। জনগণ বিদ্যুৎ চায়, আগের সরকার বকেয়া রেখে গেছে, এটা তারা দেখবে না। সরকার তো মাত্র এসেছে। এর মধ্যে পুরোনো বকেয়া আদায়ে ব্যবসায়ীরা অস্থির হয়ে গেছেন। এসব নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। তাঁর আশা, জ্বালানির ব্যবস্থা করতে পারলে লোডশেডিং খুব বেশি হবে না।
সরকার বলছেন, গত ১৫ দিনে দেশের অন্তত ১৭টি জেলায় অভিযান চালিয়ে ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ লিটারের বেশি অবৈধভাবে মজুত জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৬৫ লিটার ডিজেল, ৪৬ হাজার ১৪৬ লিটার পেট্রোল এবং ২২ হাজার ৫৩৯ লিটার অকটেন রয়েছে।
জানা গেছে, দেশে জ্বালানি তেলের প্রকৃত কোনো ঘাটতি নেই, সরকার নিয়মিত তেল সরবরাহ করছে তবে কিছু মজুতদারের কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
এদিকে, ঢাকা শহরসহ জেলা ও উপজেলায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রোল ও অকটেনের সংকট ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন মোটরবাইক চালক, প্রাইভেটকার ব্যবহারকারীসহ পেট্রোলচালিত যানবাহনের চালকরা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলেন, গুজব ও আতঙ্কে অতিরিক্ত তেল কেনা এবং অবৈধ মজুতের কারণে অনেক জায়গায় সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এজন্য সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে নিয়ম মেনে তেল নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাজধানীর মগবাজারে গুলফেশা প্লাজায় সংগঠনটির কার্যালয়ে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। এসময় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের ইস্পাত খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম। রড উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও ট্রাকের জন্য প্রতিদিন প্রতিষ্ঠানটির ৩৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদনে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) তপন সেনগুপ্ত গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে আমরা ৯ হাজার লিটার ডিজেল পেয়েছি। গত রোববার কোন তেল পাইনি। যার কারণে আমাদের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে।’
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দেওয়ায় চট্টগ্রামের বিএসআরএম গ্রুপের মতো অন্য শিল্পকারখানাও নানাভাগে এই সংকটে ভুগছে। চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় অনেক শিল্পকারখানা তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। আবার অনেক শিল্পকারখানার পণ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা বলছেন, অনিরাপদ পরিবেশে তেল সংরক্ষণ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে। জ্বালানি তেল অত্যন্ত দাহ্য হওয়ায় সামান্য আগুনের স্পর্শেই বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মতে, অনুমোদিত নিরাপদ স্টোরেজ ও নির্ধারিত নিরাপত্তা মান বজায় না রেখে জ্বালানি সংরক্ষণ করলে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়।
শিল্পকারখানার মালিকেরা বলছেন, ঈদের লম্বা ছুটির পর শিল্পকারখানা পুরোদমে খুলেছে। ফলে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহে তেলের চাহিদা বেড়েছে। দ্রুত তেল সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নতি না হলে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। তাই তেল সরবরাহের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রয়োজনে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিংয়ের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই বর্তমানে যাত্রী পরিবহনের পরিবর্তে পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিচ্ছেন। পরে সেই পেট্রোল বা অকটেন খোলা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করছেন কিংবা বোতলে ভরে মজুত করছেন। তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে তেলের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, আগে যে পরিমাণ চাহিদা ছিল, সেই অনুপাতে সরকার তেল সরবরাহ করে আসছিল এবং এখনো একইভাবে সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। তবে এখন গ্রাহকদের চাহিদা দুই থেকে তিনগুণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এমনকি বাসাবাড়িতে অভিযান চালিয়েও তেল মজুতের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।
এসময় সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, সন্ধ্যার পর পেট্রোল পাম্পে তেল বিক্রি করতে গিয়ে প্রায়ই কিছু দুষ্টু চক্রের উৎপাত দেখা যায়। তারা পাম্পে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, ফলে অন্য গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ও ভোগান্তি বাড়ে। এ কারণে পাম্পে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তেল বিক্রির সময়সীমা নির্ধারণের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, জ্বালানি তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তার মধ্যে সোমবার (৩০ মার্চ) সারাদেশে অভিযান চালিয়ে ৮৭ হাজার ৭০০ লিটার অবৈধ মজুতকৃত জ্বলানি তেল জব্দ করা হয়।
ইরানে হামলা, পাল্টা হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা চলছে। ফলে গোটা বিশ্বে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে এক ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
ভিওডি বাংলা/আরআর







