• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

হামের টিকা বঞ্চিত ৫–৮ লাখ শিশু, ভবিষ্যতে বড় প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি

রুদ্র রাসেল    ৬ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৪ এ.এম.
ছবি: সংগৃহীত

নীরবে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে হাম। এর কেন্দ্রবিন্দুতে আছে টিকা না পাওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকা নেওয়া শিশুরা। 
সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে এখনো প্রায় ৫ থেকে ৮ লাখ শিশু হামের টিকা থেকে বঞ্চিত—যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যদিও দেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে সফলতার সঙ্গে পরিচালিত হয়ে আসছে, তবুও এই কয়েক লাখ শিশুর টিকা না পাওয়া ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফ এর তথ্য অনুযায়ী, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে এই হার অনেক ক্ষেত্রে ৯০ থেকে ৯৬ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। এই ছোট ঘাটতিই কয়েক লাখ শিশুকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।
 
বিশেষ করে শহরের বস্তি, নদীভাঙন এলাকা, দুর্গম গ্রাম এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে টিকাদান কভারেজ তুলনামূলকভাবে কম—যেখানে এই বঞ্চিত শিশুদের বড় অংশ বসবাস করে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে খুব সহজেই ছড়ায়। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে আশেপাশের প্রায় ৯০ শতাংশ অনাক্রম্য ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে।

প্রাথমিকভাবে জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে সারা শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলেও, অনেক ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক জটিলতায় রূপ নিতে পারে। নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কের সংক্রমণ বা এনসেফালাইটিসের মতো জটিলতা শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। 

ডব্লিউএইচও’র হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার মানুষ হামে মারা গেছে, যাদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
বাংলাদেশে এক্সপ্যানডেড প্রোগ্রাম অন ইমুনাইজেশন (ইপিআই) এর আওতায় নিয়মিতভাবে শিশুদের টিকা দেওয়া হলেও, কোভিড-১৯ মহামারির সময় এই কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। ফলে অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ের টিকা নিতে পারেনি। পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও সেই “গ্যাপ” এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি।
 
সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৫ লাখ শিশু পূর্ণ টিকাদান থেকে বঞ্চিত, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ হামের টিকাও পায়নি বা অসম্পূর্ণ রয়েছে। এই বাস্তবতা থেকেই অনুমান করা হচ্ছে যে, মোট হামের টিকা না পাওয়া বা অসম্পূর্ণ থাকা শিশুর সংখ্যা ৫ থেকে ৮ লাখের মধ্যে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি সম্ভাব্য সংকেত। কারণ হামের ভাইরাস অত্যন্ত দ্রুত ছড়াতে পারে এবং একটি ছোট অনাক্রম্য জনগোষ্ঠী থেকেই বড় প্রাদুর্ভাব শুরু হতে পারে। অতীতে দেখা গেছে, টিকাদানের সামান্য ঘাটতির কারণেই বিভিন্ন দেশে হামের বড় আকারের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। বাংলাদেশেও একই ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যেখানে সংক্রমণ দ্রুত ছড়ানোর সুযোগ বেশি।

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, টিকা বঞ্চিত এই শিশুদের কারণে শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও তৈরি হতে পারে। একটি হামের প্রাদুর্ভাব মানে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি এবং অনেক ক্ষেত্রে স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া। নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য এটি আরও বড় সংকট তৈরি করে, কারণ চিকিৎসা ব্যয় তাদের আর্থিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে দেয়।

এদিকে, টিকাদান কর্মসূচিতে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের মধ্যে ভ্যাকসিন নিয়ে ভুল ধারণা, সচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবায় পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতা টিকাদান কভারেজে প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু টিকা সরবরাহ করলেই হবে না—একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি। এমএমআর ভ্যাকসিনের মতো নিরাপদ ও কার্যকর টিকা থাকা সত্ত্বেও এই ঘাটতি থাকাটা একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে, যার লক্ষ্য হলো টিকা মিস করা শিশুদের দ্রুত আওতায় আনা। এই কর্মসূচির সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন, স্থানীয় সচেতনতা এবং অভিভাবকদের অংশগ্রহণের ওপর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই যদি এই ৫–৮ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা যায়, তবে ভবিষ্যতের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ করা সম্ভব।
 মোটা দাগে, “হামের টিকা পায়নি প্রায় ৫–৮ লাখ শিশু”—এই তথ্যটি শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা। এটি দেখিয়ে দেয় যে, টিকাদান কর্মসূচিতে সামান্য ঘাটতিও কত বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ—যেখানে সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ মানুষ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ, এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই ঝুঁকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/আ

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
দেশের সকল নৌযানকে ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন প্রদান করা হবে: নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী
দেশের সকল নৌযানকে ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন প্রদান করা হবে: নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী
যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মী পাঠানো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে: সংসদে মন্ত্রী
যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মী পাঠানো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে: সংসদে মন্ত্রী
নতুন বেতনকাঠামোর সুপারিশ আরও পর্যালোচনা হবে
নতুন বেতনকাঠামোর সুপারিশ আরও পর্যালোচনা হবে