• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

দড়ি ও বাঁশে ভর করে মসজিদে যাওয়া সেই মুয়াজ্জিনের মৃত্যু

নাটোর প্রতিনিধি    ৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০১ এ.এম.
আব্দুর রহমান মোল্লা-ছবি-ভিওডি বাংলা

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার আলোচিত শতবর্ষী অন্ধ মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান মোল্লা আর নেই। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর ধর্মনিষ্ঠার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা এই মানুষটি রোববার (৫ এপ্রিল) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নিজ বাড়িতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ১২০ বছর। সোমবার (৬ এপ্রিল) সকাল ৯টায় বড়দেহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

আব্দুর রহমান মোল্লা বড়াইগ্রাম উপজেলার নগর ইউনিয়নের বড়দেহা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। জীবনের শেষ দুই দশক তিনি দৃষ্টিশক্তিহীন অবস্থায় কাটালেও তার মনোবল ছিল অটুট। প্রায় ২২ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও তিনি জীবন থামিয়ে দেননি। বরং নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তোলেন ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্য দিয়ে।   

পরিবার সূত্রে জানা যায়, দৃষ্টিশক্তি হারানোর কয়েক বছর পর বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পবিত্র হজ পালন করেন। হজ থেকে ফিরে ধর্মীয় কাজে আরও বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন তিনি। নিজের সামান্য সম্পদ থেকেও তিনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।

নিজের মালিকানাধীন প্রায় ৫ শতাংশ জমির ওপর একটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করেন আব্দুর রহমান মোল্লা। শুধু নির্মাণই নয়, তিনি জমিটি মসজিদের নামে রেজিস্ট্রি করে দেন, যাতে ভবিষ্যতে এটি ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হয়। এরপর তিনি নিজেই ওই মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

তবে তার বাড়ি থেকে মসজিদের দূরত্ব ছিল প্রায় ২০০ মিটার। দৃষ্টিশক্তি না থাকায় এই পথ পাড়ি দেওয়া ছিল বেশ কষ্টসাধ্য। কিন্তু এখানেই তিনি দেখান নিজের অসাধারণ উদ্ভাবনী শক্তি। তার নির্দেশনায় পরিবারের সদস্যরা বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তার পাশে দড়ি ও বাঁশ টাঙিয়ে দেন।

প্রথম দিকে নাতিদের সহায়তায় যাতায়াত শিখলেও পরে তিনি সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে ওই পথ ধরে মসজিদে যেতে শুরু করেন। একটি লাঠি হাতে নিয়ে দড়ি ও বাঁশ স্পর্শ করে তিনি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় মসজিদে পৌঁছে যেতেন এবং আজান দিতেন। দীর্ঘদিন ধরে এমন নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে তিনি স্থানীয়দের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে ওঠেন।

২০২৪ সালের মে মাসে তার এই ব্যতিক্রমী জীবনযাত্রার গল্প গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাকে নিয়ে প্রশংসার ঢল নামে। অনেকেই তাকে দৃঢ় মনোবল ও আত্মনির্ভরতার উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তিনি শুধু একজন মুয়াজ্জিনই ছিলেন না, বরং একজন নীরব সমাজসেবক ও ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে সবার কাছে সম্মানিত ছিলেন।

নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় তিনি বলেন, অন্ধত্ব জয় করে আব্দুর রহমান মোল্লা যেভাবে দ্বীনের পথে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন, তা সত্যিই বিরল এবং অনুসরণীয়। তার এই জীবনসংগ্রাম আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

ভিওডি বাংলা/জা

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
তনু হত্যার ১০ বছর পর ৩ জনের ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ
তনু হত্যার ১০ বছর পর ৩ জনের ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ
পেঁয়াজ চাষ করে এবার লোকসানে রাজশাহীর চাষীরা
পেঁয়াজ চাষ করে এবার লোকসানে রাজশাহীর চাষীরা
আব্দুল গফুরের হাতে বেঁচে আছে বিলীন হওয়া বেতশিল্প
আব্দুল গফুরের হাতে বেঁচে আছে বিলীন হওয়া বেতশিল্প