ঢাকায় মাদকসহ চীনের ৩ নাগরিক গ্রেপ্তার

আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে বিদেশে মাদক পাচারের এক অভিনব ও সুসংগঠিত চক্রের সন্ধান পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। চক্রটি ইন্টারনেটের অন্ধকার জগৎ ‘ডার্ক ওয়েবে’ মাদকের অর্ডার নিত এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন করত। রাজধানীর উত্তরায় একটি ফ্ল্যাটে থাকা আধুনিক ল্যাবরেটেরি ব্যবহার করে তরল কিটামিনকে পাউডারে পরিণত করে কুরিয়ারের মাধ্যমে বিদেশে পাচারের চেষ্টা করত তারা।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অডিটরিয়ামে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
গত ২৫ মার্চ রাতে উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকার ওই আবাসিক ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে চক্রটির তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএনসি, যারা চীন দেশের নাগরিক। তারা হলেন- লি বিন (৫৯), ইয়াং চুনশেং (৬২) এবং ইউ ঝে (৩৬)।
সেখান থেকে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কিটামিন এবং মাদক তৈরির বিপুল রাসায়নিক ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ হাসান মারুফ বলেন, ডিএনসির গোয়েন্দা বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মাদক পাচারের ওপর নজরদারি করে আসছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২৫ মার্চ ঢাকার একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসে অভিযান চালিয়ে একটি সন্দেহজনক পার্সেল আটক করা হয়।
পার্সেলটি তল্লাশি করে একটি ব্লুটুথ সাউন্ড স্পিকারের ভেতর বিশেষ কৌশলে লুকানো অবস্থায় ৫০ গ্রাম কিটামিন উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তীতে ওই পার্সেলের তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে ওই দিন রাতেই উত্তরায় চক্রটির মূল ঘাঁটিতে হানা দেন গোয়েন্দারা।
তিনি আরো বলেন, উত্তরা পশ্চিম থানার ওই আবাসিক ফ্ল্যাটে গিয়ে গোয়েন্দারা দেখতে পান, একটি কক্ষে রীতিমতো অস্থায়ী রাসায়নিক ল্যাব গড়ে তোলা হয়েছে। সেখান থেকে ৬.৩০০ কেজি কিটামিন ছাড়াও বিপুল পরিমাণ সালফিউরিক এসিড, ইথানল, অ্যালকোহল, ল্যাব সরঞ্জাম, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেটজাত করার যন্ত্রপাতি এবং দেশি-বিদেশি মুদ্রা জব্দ করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা স্বীকার করেছেন, তারা তরল কিটামিন সংগ্রহ করে এই ল্যাবে প্রক্রিয়াজাত করে পাউডারে রূপান্তর করতেন। এরপর সাউন্ড স্পিকারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ভেতর লুকিয়ে কুরিয়ারের মাধ্যমে বিদেশে পাচারের চেষ্টা করতেন।
হাসান মারুফ আরো বলেন,তদন্তে চক্রটির অভিনব সব কৌশলের তথ্য উঠে এসেছে। তারা ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মাদকের অর্ডার নিত এবং বড় পরিসরে মাদক সংগ্রহ করত। অর্থ লেনদেনের জন্য তারা পুরোপুরি ক্রিপ্টোকারেন্সির ওপর নির্ভরশীল ছিল। মূলত 'ট্রন' (টিআওএন) নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ নিত। নিজেদের কার্যক্রম আড়াল রাখতে তারা ৪ থেকে ৫ হাজার ইউএসডিটি (ইউএসডিটি) একসঙ্গে উত্তোলন করত।
গোয়েন্দারা জানান, গ্রেপ্তার আসামিরা অত্যন্ত ধূর্ত। তারা এনক্রিপ্টেড অ্যাপে যোগাযোগ করতেন, নিয়মিত ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেলতেন, সিম পরিবর্তন করতেন এবং ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করতেন। তাদের ভ্রমণ ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, তারা স্বল্প সময়ের জন্য বিভিন্ন দেশে অবস্থান করতেন এবং ঘন ঘন দেশ পরিবর্তন করতেন। ডিএনসির ধারণা, বিশ্বের একাধিক দেশে চক্রটির এমন প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাব থাকতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
হাসান মারুফ আরো জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ডিএনসি সারা দেশে তাদের গোয়েন্দা তৎপরতা ও বিশেষ অভিযান জোরদার করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় এই আন্তর্জাতিক চক্রটিকে ধরা সম্ভব হয়েছে।
ডিএনসি সতর্ক করে জানিয়েছে, কিটামিন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিপজ্জনক ডিসোসিয়েটিভ ড্রাগ। এটি সেবনে বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণহীনতা দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি কিডনি ও মূত্রথলির মারাত্মক ক্ষতিসহ প্রাণঘাতী ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
গ্রেপ্তার আসামিদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ডিএনসি।
ভিওডি বাংলা/এসআর







