• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

সাঙ্গু নদীতে ফুল নিবেদনের মধ্যদিয়ে শুরু বিজু-বিষু উৎসব

বান্দরবান প্রতিনিধি    ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩৬ এ.এম.
সাঙ্গু নদীতে ফুল নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে পাহাড়ের অন্যতম বড় সামাজিক উৎসব বিজু ও বিষু:ছবি-ভিওডি বাংলা

বান্দরবানের সাঙ্গু নদীতে ফুল নিবেদনের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের অন্যতম প্রধান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব বিজু ও বিষু শুরু হয়েছে। 

রোববার (১২ এপ্রিল) ভোর থেকে নদীর তীরে জড়ো হয়ে ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজনে অংশ নেন চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষ।

প্রতিবছরের মতো এবারও সূর্যোদয়ের আগেই বিভিন্ন বয়সী মানুষ নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ফুল হাতে নদীর পাড়ে সমবেত হন। পরে তারা ‘জলবুদ্ধ’ ও ‘মা গঙ্গাদেবী’র উদ্দেশ্যে ফুল নিবেদন করেন। এ সময় তারা অতীত বছরের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং নতুন বছরে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির কামনা জানান।

উৎসবে অংশ নেওয়া অর্নি চাকমা বলেন, পুরনো বছরের দুঃখ-কষ্ট ও গ্লানি ভুলে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতেই এই ফুল নিবেদন। এর মাধ্যমে সবাই নিজের ও পরিবারের কল্যাণ কামনা করেন।

একই কথা জানান রিমিতা চাকমা। তিনি বলেন, প্রতিবছর এই দিনটিতে তারা প্রার্থনার মাধ্যমে নতুন বছরের জন্য শুভ কামনা করেন। “গত বছর যেমনই কাটুক, সামনে যেন শান্তিতে থাকতে পারি-এই কামনাতেই বিজু শুরু হয়,” বলেন তিনি।

তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের লজ্জাবতী তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে তারা অতীতের সব কষ্টকে বিদায় জানান। তার ভাষায়, “সব দুঃখ যেন স্রোতের সঙ্গে ভেসে যায়, আর সামনে সুখ ও উন্নতির দিন আসে-এই কামনায় আমরা ফুল নিবেদন করি।”

পার্বত্য চট্টগ্রামের এই উৎসবটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে ভিন্ন নামে পরিচিত হলেও এর মূল চেতনা এক। চাকমাদের কাছে ‘বিজু’, মারমা ও চাক সম্প্রদায়ের কাছে ‘সাংগ্রাইং’, ত্রিপুরাদের কাছে ‘বৈসু’, তঞ্চঙ্গ্যাদের কাছে ‘বিষু’, ম্রোদের কাছে ‘চাংক্রান’, খেয়াংদের কাছে ‘সাংলান’, অহমীয়দের কাছে ‘বিহু’ এবং সাঁওতালদের কাছে ‘বাহা উৎসব’ নামে পরিচিত।

নামের ভিন্নতা থাকলেও উৎসবের আনন্দ ও তাৎপর্য সবার জন্য অভিন্ন। দীর্ঘদিন ধরে পালিত এই উৎসব পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।

উৎসবকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ। বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পিঠা-পায়েস তৈরির প্রস্তুতি।

চাকমা সম্প্রদায়ের মতে, ১২ এপ্রিল ‘ফুল বিজু’, ১৩ এপ্রিল ‘মূল বিজু’ এবং ১৪ এপ্রিল ‘গজ্জ্যাপজ্জ্যা’ হিসেবে পালিত হয়। এ সময় ঘরে ঘরে বিশেষ খাবারের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে ‘পাজন’ নামে একটি বিশেষ তরকারি অন্যতম, যা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি করা হয় এবং অতিথিদের আপ্যায়নে পরিবেশন করা হয়।

স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অন্তত সাতটি ঘরে গিয়ে এই পাজন তরকারি খেলে রোগব্যাধি কমে বা সুস্থতা লাভ হয়। এই উৎসবে কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিমন্ত্রণ করার প্রচলন নেই। বরং আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা বিনা নিমন্ত্রণেই একে অন্যের বাড়িতে গিয়ে অংশ নেন উৎসবের আনন্দে।

এদিকে, যেসব এলাকায় চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে, সেসব এলাকার নদী ও খালেও একইভাবে ফুল নিবেদন ও মোমবাতি প্রজ্বালনের মাধ্যমে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে।

উৎসবের সময়সূচি অনুযায়ী, চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের অনুষ্ঠান ১২ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাইং উৎসব চলবে ১৩ থেকে ১৭ এপ্রিল এবং ত্রিপুরাদের বৈসু উৎসব পালিত হবে ১৩ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত।

তবে এ বছর বান্দরবানে মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাইং উৎসবকে ঘিরে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। নতুন ও পুরনো কমিটির মধ্যে মতবিরোধের কারণে এবার দুটি পৃথক স্থানে উৎসব আয়োজন করা হচ্ছে। নতুন কমিটি রাজার মাঠে এবং পুরনো কমিটি উজানি পাড়া সাঙ্গু নদীর বালুচরে তাদের অনুষ্ঠান করবে।

এছাড়া উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন আয়োজনের মধ্যে রয়েছে ১২ এপ্রিল রোয়াংছড়ি উপজেলার বেক্ষ্যং নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ঘিলা খেল প্রতিযোগিতা, ১৩ এপ্রিল সম্মিলিত সাংগ্রাইং র‌্যালি, ১৪ এপ্রিল বুদ্ধমূর্তিকে স্নান করানো ও পহেলা বৈশাখ উদযাপন এবং ১৫ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত ‘মৈতা রিলং পোয়ে’ বা মৈত্রী পানি বর্ষণ অনুষ্ঠান।

ভিওডি বাংলা/জা

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
কুকুর-কুমির ঘটনার তদন্তে দোষীদের শাস্তির নির্দেশ প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর
কুকুর-কুমির ঘটনার তদন্তে দোষীদের শাস্তির নির্দেশ প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর
এক্সপ্রেসওয়েতে কাভার্ড ভ্যান-বাসের সংঘর্ষ, নিহত ১
এক্সপ্রেসওয়েতে কাভার্ড ভ্যান-বাসের সংঘর্ষ, নিহত ১
দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ, উদ্বোধন হলো ধলিয়া-লেমুয়া সড়ক
দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ, উদ্বোধন হলো ধলিয়া-লেমুয়া সড়ক