• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

হাসপাতাল এলাকাগুলোতে ভয়াবহ শব্দদূষণ: শীর্ষে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী

নিজস্ব প্রতিবেদক    ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫৯ পি.এম.
ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি

শব্দদূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতাল এলাকায়। তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকার পল্লবীর সিরামিক রোড এবং তৃতীয় অবস্থানে রংপুরের গুঞ্জন মোড়। দেশজুড়ে ৫২৬টি স্থানে পরিচালিত পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিপে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

জরিপ অনুযায়ী, চট্টগ্রামের বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতাল (বিবিএমএইচ) এলাকায় দিনের বেলায় শব্দের মাত্রা রেকর্ড হয়েছে সর্বোচ্চ ১১০ দশমিক ৯০ ডেসিবল। অন্যদিকে রাতে সর্বোচ্চ শব্দদূষণ পাওয়া গেছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায়—১০০ দশমিক ৮০ ডেসিবল। অথচ সাধারণ মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য শব্দমাত্রা ৫০ থেকে ৬০ ডেসিবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালের মতো নীরব এলাকা হিসেবে নির্ধারিত স্থানে এমন উচ্চমাত্রার শব্দদূষণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

পরিবেশ অধিদপ্তর ২০২২ থেকে ২০২৫ সময়কালে দেশের ৬৪ জেলার ৫২৬টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করে এ জরিপ পরিচালনা করে। ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশগ্রহণমূলক প্রকল্প’-এর আওতায় পরিচালিত এই জরিপে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর ও রাজশাহীর একাধিক এলাকাকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যানবাহনের চাপ, অনিয়ন্ত্রিত হর্ন, নির্মাণকাজ এবং শিল্পকারখানার শব্দকে দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

জরিপে দিনে ও রাতে আলাদাভাবে শব্দমাত্রা নির্ণয় করা হয়। নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প—এই পাঁচ ধরনের ভূমি ব্যবহার শ্রেণির ভিত্তিতে স্বাভাবিক শব্দমাত্রার মানও নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে নীরব এলাকায় দিনে ৫০ ডেসিবল ও রাতে ৪০ ডেসিবল, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ও রাতে ৪৫ ডেসিবল, মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০ ও রাতে ৫০ ডেসিবল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ও রাতে ৬০ ডেসিবল এবং শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ও রাতে ৭০ ডেসিবলকে স্বাভাবিক ধরা হয়।

জরিপের তথ্যে দেখা যায়, দিনের বেলায় চট্টগ্রামের বিবিএমএইচ এলাকায় শব্দমাত্রা সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। নীরব এলাকা হিসেবে নির্ধারিত হওয়া সত্ত্বেও সেখানে ১১০ দশমিক ৯০ ডেসিবল শব্দ রেকর্ড করা হয়। একই এলাকায় রাতে শব্দের মাত্রা দাঁড়ায় ৮২ দশমিক ৬ ডেসিবল, যা নির্ধারিত মানের দ্বিগুণেরও বেশি। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ ও হর্ন ব্যবহারের কারণেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

ঢাকার পল্লবীর সিরামিক রোড এলাকায় দিনে শব্দমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০৯ দশমিক ২০ ডেসিবল। শিল্প এলাকা হিসেবে স্বীকৃত এই স্থানে অনুমোদিত সীমা ৭৫ ডেসিবল হলেও তা অতিক্রম করে ১০৫ দশমিক ২০ ডেসিবলে পৌঁছায় শব্দ।

তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে থাকা রংপুরের গুঞ্জন মোড় এলাকায় আবাসিক শ্রেণির মানমাত্রার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ শব্দ পাওয়া গেছে—দিনে ১০৫ দশমিক ২০ ডেসিবল। এর পর রয়েছে ঢাকার তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা রাউন্ডঅ্যাবাউট, যেখানে দিনে ১০২ দশমিক ১০ এবং রাতে ৯১ দশমিক ৪০ ডেসিবল শব্দ রেকর্ড করা হয়।
চট্টগ্রামের পাঠানটুলী এলাকায় দিনে ১০১ দশমিক ১০ ডেসিবল, ঢাকার শান্তিনগরে ৯৭ দশমিক ৩০ ডেসিবল এবং আরামবাগ এলাকায় ৯৫ দশমিক ৪০ ডেসিবল শব্দদূষণ পাওয়া গেছে।

রাতের বেলায় সবচেয়ে বেশি শব্দদূষণ শনাক্ত হয়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায়—১০০ দশমিক ৮০ ডেসিবল। এরপর রয়েছে রাজশাহীর বিন্দুর মোড় (১০০ দশমিক ৫০ ডেসিবল) এবং চট্টগ্রামের ওয়্যারলেস এলাকার ডায়াবেটিক হাসপাতালসংলগ্ন এলাকা (৯৯ দশমিক ৫০ ডেসিবল)। চতুর্থ অবস্থানে থাকা চট্টগ্রামের কালামিয়া বাজারেও একই মাত্রার শব্দ রেকর্ড করা হয়। ঢাকার শ্যামলী, তেজগাঁও ও সচিবালয় এলাকাতেও রাতের শব্দমাত্রা স্বাভাবিক সীমার অনেক ওপরে পাওয়া গেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৬৪ জেলার মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১৭০টি, চট্টগ্রামে ৯১টি, রাজশাহীতে ৪৫টি, খুলনায় ৬৫টি, বরিশালে ৪০টি, সিলেটে ৩৫টি, ময়মনসিংহে ৩০টি এবং রংপুরে ৫০টি স্থানে জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে অধিকাংশ স্থানেই স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি শব্দ পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের (মহানগর) সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান বলেন, ‘জরিপ চলাকালে দিনে চট্টগ্রামের বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতাল (বিবিএমএইচ) এবং ওয়্যারলেস এলাকায় রাতে শব্দদূষণের মাত্রা অত্যধিক পাওয়া যায়। এসব এলাকায় গাড়ির চাপ অত্যধিক বেশি থাকায় শব্দদূষণের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। কালামিয়া বাজারেও গাড়ির চাপ ও অতিরিক্ত হর্ন ব্যবহারের ফলে অসহনীয় শব্দদূষণ হয়। স্বাভাবিক সুস্থ-সবল মানুষের পক্ষে ৪০ থেকে ৫০ ডেসিবল মানমাত্রার শব্দ সহ্য করার ধারণক্ষমতা আছে। অতিরিক্ত শব্দের কারণে মানুষ বধির হয়ে যাওয়া ছাড়াও দীর্ঘমেয়াদে নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারে।’

তিনি আরও জানান, সম্প্রতি শব্দদূষণ কমাতে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গাড়িচালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কীভাবে তারা গাড়ির হর্ন ব্যবহার কমাতে পারবে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নির্মাণকাজে ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহার, উচ্চশব্দের হর্ন, পুরনো যানবাহন, জেনারেটরের শব্দ এবং মাইক-সাউন্ড সিস্টেমের অতিরিক্ত ব্যবহার শহরাঞ্চলে শব্দদূষণকে ক্রমেই ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রার শব্দের সংস্পর্শে থাকলে শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, মানসিক চাপ ও স্মৃতিশক্তি হ্রাসের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীরা এ ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকে।

জরিপের পরিচালক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের (ঢাকা মহানগর) পরিচালক ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘৬৪টি জেলায় জরিপ করতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন বিষয় দেখতে পেয়েছি। যেখানে মানুষের পদচারণা এবং যানবাহন চলাচল বেশি সেখানেই শব্দের মাত্রা নির্দিষ্ট ডেসিবলের বেশি পাওয়া গেছে। এ মাত্রা মানুষের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বিশেষত শিশুদের জন্য। শব্দদূষণ প্রতিরোধে শুধু ডিএমপিতেই ১৭ হাজার জনকে মামলা ও জরিমানা করা হয়েছে। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২৫-এর আওতায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মানুষকে মামলা, জেল-জরিমানা দিয়ে শব্দদূষণের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব না। মানুষ সচেতন হলে শব্দদূষণ কমে আসবে।’

ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/এমএস 

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
পাম্পে কমছে দীর্ঘ লাইন, ফিরছে স্বস্তি
পাম্পে কমছে দীর্ঘ লাইন, ফিরছে স্বস্তি
রাজধানীর যানজট নিরসনে ট্রাম চালুর পরিকল্পনা
রাজধানীর যানজট নিরসনে ট্রাম চালুর পরিকল্পনা
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতি কী বার্তা দিচ্ছে?
এক্সপ্লেইনার: মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতি কী বার্তা দিচ্ছে?