ইনসাফ, ইসলামের সামাজিক দর্শনের ভিত্তি

পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাস প্রধানত এমন কিছু প্রশ্নের সন্ধানে রচিত- মানুষ কীভাবে একে অপরের সঙ্গে বাঁচবে? ক্ষমতাশালী কি দুর্বলকে গ্রাস করবে? ধনী কি দরিদ্রের রক্ত শুষবে? শাসক কি প্রজার ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানবজাতি হাজার বছর ধরে দর্শন রচনা করেছে, বিপ্লব ঘটিয়েছে, রক্ত ঢেলেছে।
কিন্তু ইসলাম চৌদ্দশ বছর আগেই একটি সুসংহত, পূর্ণাঙ্গ উত্তর দিয়েছিল- সেই উত্তরের নাম ‘আদল’, অর্থাৎ ন্যায়বিচার। ইসলামে ন্যায়বিচার কোনো রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ নয়, কোনো দলীয় ইশতেহারের ধারা নয়, কোনো মৌসুমি প্রতিশ্রুতি নয়; বরং এটি আল্লাহ তায়ালার নিজস্ব গুণ, তাঁর সত্তার একটি অনিবার্য প্রকাশ। তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার আদেশ দেন।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৯০)
এই একটি আয়াতে পুরো একটি সামাজিক সনদ লুকিয়ে আছে। ‘আদল’ অর্থ শুধু আদালতের রায় নয়; এর আক্ষরিক অর্থ হলো সমান ওজন, সোজা দাঁড়িপাল্লা, বাঁকহীন সরলরেখা। সমাজের প্রতিটি সম্পর্কে, প্রতিটি লেনদেনে, প্রতিটি মানবিক মিথস্ক্রিয়ায় এই সমতা বজায় রাখাই ইসলামের মৌলিক দাবি। ‘ইহসান’ মানে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া- ন্যায্য অধিকারের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ভালোবাসা, করুণা ও উদারতা দেখানো। আর ‘ইতাই জিল কুরবা’ মানে আপনজনের প্রতি দায়িত্ব পালন। এই তিনটি স্তম্ভের ওপর ইসলামের সামাজিক দর্শন দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথমে ন্যায্যতা, তারপর মহানুভবতা, তারপর পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন। একটি সমাজ যদি এই তিনটি গুণ অর্জন করতে পারে, তা হলে সেখানে শোষণ, বৈষম্য এবং কোনো অত্যাচার টিকতে পারে না। ‘জুলুম কেয়ামতের দিন অন্ধকার হবে’- এই হাদিসের ভাষ্য বলছে, পৃথিবীতে যে অন্যায় করা হয়, তার অন্ধকার কবর পর্যন্ত, হাশর পর্যন্ত পিছু ছাড়ে না।
ইসলামের ন্যায়দর্শন বোঝার জন্য আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে এই ধর্ম মানুষকে কীভাবে দেখে। কুরআন বলছে, সব মানুষ আদম ও হাওয়ার সন্তান। এই একটি ঘোষণাই বর্ণবাদ, শ্রেণিবৈষম্য ও জাতিগত উচ্চাভিমানের মূলে কুঠারাঘাত করে। মক্কার মাটিতে যে আরব সমাজ ছিল, সেখানে কুরাইশ বংশ ছিল শ্রেষ্ঠ, দাস ছিল বস্তুর মতো, নারী ছিল উত্তরাধিকারের সম্পদ। সেই সমাজে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করলেন, ‘কোনো আরবের ওপর অনারবের, অনারবের ওপর আরবের, লাল বর্ণের ওপর কালো বর্ণের এবং কালোর ওপর লালের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি কেবল তাকওয়া’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩৪৮৯)।
বিদায় হজের এই ঘোষণা শুধু একটি ভাষণ ছিল না, এটি ছিল মানবাধিকারের প্রথম সার্বজনীন সনদ। জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্র রচিত হয়েছে ১৯৪৮ সালে। কিন্তু ইসলাম এই একই বার্তা দিয়েছিল সপ্তম শতাব্দীতে, মরুভূমির বুকে, যখন পৃথিবীর বাকি সভ্যতা এখনও মানুষকে বর্ণ ও বংশ দিয়ে মাপে।
ইসলামের ন্যায়দর্শনের সবচেয়ে বিপ্লবী দিকটি হলো, এটি শাসককেও আইনের ঊর্ধ্বে রাখে না। রাষ্ট্রক্ষমতা যেন জুলুমের হাতিয়ার না হয়, সে জন্য কুরআন বারবার সতর্ক করেছে। হজরত আলি (রা.)-এর শাসনামলে একটি ঘটনা রয়েছে যা ইতিহাসে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁর বর্ম একজন অমুসলিম ইহুদি লোকের কাছে পাওয়া যায়।
হজরত আলি (রা.) দাবি করেন যে বর্মটি তাঁর। বিষয়টি কাজির আদালতে উঠলে বিচারক হজরত শুরাইহ (রা.) জিগ্যেস করেন, তোমার কাছে সাক্ষী আছে? আলি (রা.) বললেন, আমার ছেলে ও দাস সাক্ষী। বিচারক বললেন, পুত্র পিতার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে পারে না, এটি গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং মামলার রায় ইহুদির পক্ষে হলো। খলিফা আলি (রা.) মুসলিম জগতের শাসক, আদালতে হেরে গেলেন একজন অমুসলিম নাগরিকের কাছে।
ইতিহাস এখানে থেমে থাকেনি। সেই ইহুদি লোকটি মুগ্ধ হয়ে বলল, এই বর্ম আসলেই আপনার ছিল হে আমিরুল মুমিনিন। আমি পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম এই বিচারব্যবস্থা সত্যিই নিরপেক্ষ কি না। এই সত্যতা দেখে আমি ইসলামে দীক্ষিত হলাম। এই ঘটনাটি শুধু একটি আইনি নজির নয়, বরং এটি একটি সভ্যতার আত্মার প্রতিফলন।
আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ় থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষী হও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে হয়, অথবা পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৩৫)। এই আয়াতটি একটু ভেবে দেখুন। নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দাও, আপন পিতা-মাতার বিরুদ্ধেও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াও। কোনো পার্থিব আইনব্যবস্থা এই পর্যায়ে যেতে পারেনি।
আধুনিক আইনে আপনি নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য নন। কিন্তু ইসলাম বলছে, ন্যায়বিচার এতটাই পবিত্র যে নিজের ক্ষতি হলেও তা প্রতিষ্ঠা করো। এটি কেবল একটি আইনি নির্দেশনা নয়, এটি মানুষকে সত্যের সামনে আত্মসমর্পণ করতে শেখানো। ইসলামের অর্থনৈতিক ন্যায়দর্শন পৃথিবীর যেকোনো সামাজিক মতবাদের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও মানবিক।
সমাজতন্ত্র ব্যক্তিগত সম্পদ অস্বীকার করে ব্যর্থ হয়েছে, পুঁজিবাদ অসীম সম্পদ কেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে শোষণ জন্ম দিয়েছে। ইসলাম এই দুটির মাঝে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ দিয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৈধ, কিন্তু তার ওপর সমাজের অধিকারও আছে। জাকাতের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক পুনর্বণ্টন, সুদ নিষিদ্ধ করে শোষণমুক্ত অর্থনীতির স্বপ্ন এবং মিরাসের মাধ্যমে সম্পদের স্বাভাবিক বিকেন্দ্রীকরণ- এগুলো একসঙ্গে মিলে একটি অনন্য অর্থনৈতিক ন্যায়ব্যবস্থা তৈরি করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জুলুম থেকে বেঁচে থাকো, কারণ জুলুম কেয়ামতের দিন অন্ধকার হবে’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৭৮)। এই হাদিসে ‘জুলুম’ শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে- অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক অত্যাচার, সামাজিক বঞ্চনা, ব্যক্তিগত অবিচার সবকিছুই এর আওতায় পড়ে এবং পরিণামের ভয়াবহতা বর্ণনা করা হয়েছে ‘অন্ধকার’ দিয়ে, সেই অন্ধকার যেন বুকের ভেতর থেকে ছড়িয়ে পড়ে।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, ইসলামের এই সুন্দর ন্যায়দর্শন বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে? মুসলিম ইতিহাসে অনেক উজ্জ্বল অধ্যায় আছে, অনেক অন্ধকার অধ্যায়ও আছে। কিন্তু যখনই মুসলিম সমাজ কুরআন ও সুন্নাহর এই নীতিগুলো প্রকৃতপক্ষে অনুসরণ করেছে, তখনই সমাজে আলো জ্বলেছে। হজরত ওমর (রা.)-এর শাসনামলে এক বৃদ্ধা তার সন্তানদের নিয়ে কাঁদছিলেন কারণ তার ঘরে খাবার নেই। খলিফা নিজে বস্তা কাঁধে করে তার ঘরে খাবার পৌঁছে দিলেন। এটি শুধু ব্যক্তিগত দয়া নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের স্বীকৃতি।
হজরত ওমর (রা.)-এর বিখ্যাত উক্তি, ‘ফুরাতের তীরে একটি কুকুরও যদি ক্ষুধার্ত হয়ে মারা যায়, কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে আমি দায়ী হব।’ একজন রাষ্ট্রপ্রধান যখন প্রাণীর ক্ষুধার জন্যও নিজেকে দায়ী মনে করেন, তখন বোঝা যায় ইসলামের রাষ্ট্রদর্শন কতটা গভীরে মানবিক দায়িত্ববোধ প্রোথিত করে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যখন মানুষের মধ্যে বিচার করো, তখন ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করো’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৮)। এই আয়াতে ‘হুকুম’ বা বিচারের যে আদেশ দেওয়া হয়েছে তা কেবল বিচারকের জন্য নয়; পরিবারের কর্তা যখন সন্তানদের মধ্যে ফয়সালা করেন, নেতা যখন দলের সদস্যদের মধ্যে সমস্যা মেটান, শিক্ষক যখন ছাত্রদের মধ্যে বিচার করেন সব ক্ষেত্রেই এই আয়াতের আহ্বান প্রযোজ্য। ন্যায়বিচার কেবল আদালতের বিষয় নয়, এটি প্রতিটি দায়িত্বশীল মানুষের দৈনন্দিন কর্তব্য।
আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমরা এমন একটি সমাজে বাস করছি যেখানে বিচার পাওয়া অনেক সময় সম্পদ ও প্রভাবের ওপর নির্ভর করে। যেখানে দরিদ্রের মামলা বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে থাকে, আর ধনীর মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় আইনি পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে যায়। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ইসলামের ন্যায়দর্শন শুধু আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা নয়, এটি একটি ব্যবহারিক সংস্কারের রূপরেখাও।
ইসলাম বলে, ক্ষমতায় যে আছে তার ওপর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে’ (সহিহ বুখারি)। এই জবাবদিহিতার ধারণাটি ইসলামের রাষ্ট্রদর্শনের কেন্দ্রে। ক্ষমতা একটি আমানত, নিজের ভোগের জন্য নয়, জনগণের কল্যাণের জন্য। যে এই আমানত খেয়ানত করে, সে শুধু রাজনৈতিক অপরাধ করে না, সে আল্লাহর আমানতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। ইসলামের ন্যায়দর্শন মানুষকে শুধু অধিকারের কথা বলে না, দায়িত্বের কথাও বলে, কারণ অধিকার ও দায়িত্ব একই মুদ্রার দুই পিঠ।
তাই ইসলামের ন্যায়দর্শন কোনো ইউটোপিয়া নয়; এটি একটি বাস্তবসম্মত, মানবিক, দিব্য নির্দেশনায় সমৃদ্ধ জীবনব্যবস্থা। এটি জানে মানুষ লোভী হতে পারে, তাই সুদ নিষিদ্ধ করেছে। এটি জানে ক্ষমতা দুর্নীতি করে, তাই জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করেছে। এটি জানে সংখ্যালঘু নির্যাতিত হতে পারে, তাই অমুসলিম নাগরিকের অধিকার আলাদাভাবে সংরক্ষণ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিকের ওপর জুলুম করে বা তার অধিকার হ্রাস করে, কেয়ামতের দিন আমি তার বিরুদ্ধে বাদী হব’ (আবু দাউদ)। এই হুঁশিয়ারি কতটা শক্তিশালী ভাবুন, স্বয়ং নবীজি (সা.) বিচারকের কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন অত্যাচারীর বিরুদ্ধে।
আমাদের সমাজে আজ যে অস্থিরতা, যে অবিচার, যে বৈষম্য, তার সমাধান নতুন কোনো মতবাদে নেই। সমাধান আছে সেই চিরন্তন বাণীতে যা আরবের মরুভূমিতে নাজিল হয়েছিল, কিন্তু যার আলো সারা পৃথিবীর জন্য। সেই আলোর নাম আদল, ইনসাফ, ন্যায়বিচার। ইসলাম সেই আলো জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব মুসলমানদের কাঁধে দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই দায়িত্ব পালন করছি?
লেখক : সুলতান মাহমুদ সরকার, এমফিল গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ভিওডি বাংলা/এসআর







