সিএনএন’র বিশ্লেষণ:
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি থেকে লাভবান হচ্ছে কারা?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের এক সপ্তাহ পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেকটাই শান্ত। দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর দুই দেশ সরাসরি সামরিক সংঘাত থেকে সরে এসেছে, যা আপাতত উভয় পক্ষের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি নয়; বরং ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য একটি অস্থায়ী কাঠামো।
সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক অর্জন: চুক্তির সবচেয়ে বড় ফল হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ বন্ধ হওয়া। এতে নতুন করে প্রাণহানি ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে উভয় দেশই সামরিক সংঘাতের বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয় থেকে সাময়িকভাবে মুক্তি পেয়েছে।
হরমুজ প্রণালী খুলছে: বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল আবারও বাড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধ চলাকালে এই পথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল, যার ফলে বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় ধাক্কা লাগে।
তবে পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। ইরান উত্তর করিডোরে চলাচলের জন্য অনুমতির শর্ত বহাল রেখেছে এবং কিছু এলাকায় মাইন থাকার কারণে জাহাজ চলাচল সীমিত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি কার্গো জাহাজে ইরানি ড্রোন হামলার অভিযোগও উঠেছে, যা উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ না হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
অর্থনৈতিক সুযোগ: চুক্তির অন্যতম বড় সুবিধা পাচ্ছে ইরান। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় দেশটি আবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রি শুরু করতে পারছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হতে পারে, যা যুদ্ধের আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আগে নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানকে ছাড়মূল্যে তেল বিক্রি করতে হতো; এখন তুলনামূলক ভালো দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিনিয়োগের সম্ভাবনা: ইরানের দাবি, বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদে তাদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরান চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত এসব অর্থ পুরোপুরি ছাড়া হবে না।
চুক্তির আওতায় ভবিষ্যতে কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগ তহবিল গঠনের কথাও আলোচনা হয়েছে, যা ইরানের অবকাঠামো ও অর্থনীতি পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো রূপরেখা প্রকাশ করা হয়নি।
পারমাণবিক পরিদর্শন নিয়ে অনিশ্চয়তা: চুক্তির অন্যতম বিতর্কিত বিষয় হলো আন্তর্জাতিক পরমাণু পরিদর্শকদের ভূমিকা।
মার্কিন প্রশাসন বলছে, জাতিসংঘ-সমর্থিত পরিদর্শকদের ইরানে কাজ করার সুযোগ থাকবে। তবে ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা কেবল আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় নিজেদের বিদ্যমান বাধ্যবাধকতা মেনে চলবে এবং পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন চূড়ান্ত সমঝোতার আগে নিশ্চিত নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যৎ আলোচনায় এই ইস্যুই সবচেয়ে বড় বিরোধের কারণ হতে পারে।
লেবানন ও আঞ্চলিক রাজনীতি: চুক্তিতে লেবাননে সামরিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে ইসরায়েল নিজেকে এই সমঝোতার বাধ্যবাধকতার মধ্যে দেখে না এবং নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করেছে।
ফলে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী, বিশেষ করে হিজবুল্লাহকে ঘিরে উত্তেজনা আবারও বাড়তে পারে এবং সেটি পুরো চুক্তিকেই ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন: এক সপ্তাহের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, এই সমঝোতা থেকে উভয় পক্ষই তাৎক্ষণিক কিছু সুবিধা পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের লাভ: যুদ্ধবিরতি, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে আংশিক স্বাভাবিকতা এবং নতুন সামরিক ব্যয় এড়ানোর সুযোগ।
ইরানের লাভ: তেল রপ্তানির পথ খুলে যাওয়া, সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আশা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফেরার সুযোগ।
তবে এটি এখনো স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা দেয় না। পারমাণবিক কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক পরিদর্শন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক প্রক্সি সংঘাত—এসব জটিল প্রশ্নের সমাধান না হলে ভবিষ্যতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
ভিওডি বাংলা/বিন্দু








মন্তব্য