ছাত্রদলে থাকছে না ঢাবি আধিপত্য, ‘সুপার ফাইভে’ নারী নেতৃত্ব!

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনকে ঘিরে সংগঠনের ভেতরে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। দীর্ঘদিনের আন্দোলনকেন্দ্রিক রাজনীতির পর এখন সরকার-সমর্থক ছাত্রসংগঠন হিসেবে নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। এ প্রেক্ষাপটে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে নিয়মিত শিক্ষার্থী, আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, নারী নেতৃত্ব এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নেতৃত্বের বাইরে থেকে যোগ্যদের মূল্যায়নের মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে আঞ্চলিক ভারসাম্য, প্রজন্মগত পরিবর্তন এবং দীর্ঘদিনের কিছু বিতর্কিত চর্চা থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকার সময় ছাত্রদলের নেতৃত্ব নিয়ে সবচেয়ে বড় সমালোচনার একটি ছিল শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিলেন না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং ছাত্ররাজনীতির বাস্তব চাহিদা পূরণে নেতৃত্বের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সংগঠনের অভ্যন্তরেও এ নিয়ে অসন্তোষ ছিল। এবার সেই বাস্তবতা বদলাতে চায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব।
দলীয় সূত্র বলছে, নতুন কেন্দ্রীয় কমিটিতে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে ইতোমধ্যেই নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা নেতাদের মূল্যায়ন, সাংগঠনিক দক্ষতা, ত্যাগ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতাকে নেতৃত্ব নির্বাচনের অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকাই নেতৃত্বের যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হবে না বলেও সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা মত দিয়েছেন।
সংগঠনের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মাঠের রাজনীতি, সাংগঠনিক উপস্থিতি এবং সংকটময় সময়ে ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ বিরোধী দলের দীর্ঘ আন্দোলনের সময় যারা মাঠে সক্রিয় ছিলেন, তাদের মূল্যায়নের দাবিও তৃণমূল থেকে জোরালোভাবে উঠেছে। একই সঙ্গে ছাত্রদলকে ভবিষ্যতের জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আরও কার্যকর করে গড়ে তোলার চিন্তাও রয়েছে।
নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণও এবার অন্যতম আলোচনার বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব বেশি থাকলেও এবার দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি জেলা পর্যায়ের যোগ্য নেতাদেরও শীর্ষ নেতৃত্বে আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংগঠনের একাধিক সূত্রের দাবি, ‘সুপার ফাইভ’ বা ‘সুপার সেভেন’-এও এ পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। এতে দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয়করণের অভিযোগ অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এবারের আরেকটি আলোচিত বিষয় হচ্ছে নারী নেতৃত্ব। ছাত্রদলের শীর্ষ পর্যায়ে অতীতের তুলনায় আরও কার্যকরভাবে নারী নেত্রীদের অন্তর্ভুক্তির আলোচনা চলছে। সংগঠনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্বশীল একাধিক নেতা মনে করছেন, বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী নেত্রীরা আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাই তাদের সেই অবদানের প্রতিফলন কেন্দ্রীয় কমিটিতেও থাকা উচিত। ফলে ‘সুপার ফাইভ’ বা ‘সুপার সেভেন’-এ একজন নারী নেত্রী জায়গা পেতে পারেন— এমন আলোচনা এখন সংগঠনের ভেতরে জোরালো।
এছাড়া ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মতে, শুধু পদ বণ্টন নয়, একটি কার্যকর ও সক্রিয় নেতৃত্ব তৈরিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে কমিটি গঠনের পর দীর্ঘদিন পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম না থাকা, সময়মতো সম্মেলন না হওয়া এবং বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্বের স্থবিরতা নিয়েও সমালোচনা ছিল। নতুন কমিটির মাধ্যমে সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রত্যাশা করছেন অনেকেই।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শামসুজ্জামান দুদু ভিওডি বাংলাকে বলেন, আদর্শিক, নীতিবান ও পরীক্ষিত নেতাদের মধ্য থেকেই ছাত্রদলের আগামী দিনের নেতৃত্ব বেছে নেওয়া উচিত।
ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়, ছাত্রত্ব রয়েছে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য— এমন নেতাদের নিয়েই নতুন কমিটি গঠন করা উচিত। তার মতে, নেতৃত্ব নির্বাচনে নারী-পুরুষ নয়, যোগ্যতা ও সাংগঠনিক সক্ষমতাই হওয়া উচিত একমাত্র বিবেচ্য।
পদ প্রত্যাশী ঢাকা কলেজের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিন ইশরাক ভিওডি বাংলাকে বলেন, ত্যাগ, আদর্শ ও নিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে যারা রাজপথে থেকে গুলি, হামলা, মামলা, কারাবরণ ও নির্যাতন সহ্য করেছেন, তাদের অবদান কখনো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রকৃত ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়নই একটি রাজনৈতিক সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে যারা দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের প্রতি সম্মান ও শুভকামনা রইল। আশা করি যোগ্যতা, ত্যাগ ও সাংগঠনিক অবদানের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন হবে। ইনশাআল্লাহ, আদর্শের এই পথ আরও সুদৃঢ় হোক।
ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল হালিম বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত ও সাংগঠনিকভাবে দক্ষ নেতাদেরই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সিন্ডিকেটনির্ভর কমিটি গঠনের সংস্কৃতি থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।
ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম-আহবায়ক মো. জিয়াউর রহমান খন্দকার ভিওডি বাংলাকে বলেন, সংগঠনের ত্যাগ, আদর্শ, যোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের অবদানই হবে মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি।
ছাত্রদলের সহ-সভাপতি সাফি ইসলাম মনে করেন, আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী নেতাদেরই নতুন নেতৃত্বে জায়গা দেওয়া উচিত। পাশাপাশি তিনি নিয়মিত সময়মতো কমিটি দেওয়ার সংস্কৃতি চালুর ওপরও গুরুত্ব দেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আবু হুরায়রা বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবার ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নতুন চমক দেখাতে পারেন। তার মতে, নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে। নারী বা পুরুষ— পরিচয়ের চেয়ে দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাই হবে মূল বিবেচ্য।
অন্যদিকে, শীর্ষ পদপ্রত্যাশী এক নারী নেত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা পর্যায়ে অনেক যোগ্য নেতা রয়েছেন। তাই শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নেতৃত্ব নির্বাচন না করে সারাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে ছাত্রদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, আসন্ন কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের বিষয়ে সাংগঠনিক অভিভাবক হিসেবে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্রদলের এবারের কেন্দ্রীয় কমিটি শুধু একটি সাংগঠনিক পুনর্গঠন নয়; বরং সংগঠনটি আগামী দিনে কোন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পথে এগোবে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হয়ে উঠতে পারে। নিয়মিত শিক্ষার্থী, আন্দোলনে পরীক্ষিত নেতৃত্ব, নারী প্রতিনিধিত্ব, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং সাংগঠনিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে ছাত্রদল নতুন বাস্তবতায় আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে বলে মনে করছেন তারা।
সব মিলিয়ে ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটিকে ঘিরে নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, অতীতের বিতর্ক ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এমন একটি নেতৃত্ব আসবে, যারা একদিকে আন্দোলনে পরীক্ষিত, অন্যদিকে নিয়মিত শিক্ষার্থী, সাংগঠনিকভাবে দক্ষ এবং দেশের সব অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। এখন পুরো সংগঠনের নজর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। নতুন নেতৃত্ব কতটা ভারসাম্যপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভবিষ্যতমুখী হবে, সেটিই এখন ছাত্রদলের রাজনীতির সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।
ভিওডি বাংলা/এফএ








মন্তব্য