ভারতের কাবেরী থেকে চীনের জে-২০: চার দশকের দৌড়ে কে এগিয়ে?

চার দশক আগে ভারত ও চীন যেন একই পথে হাঁটা শুরু করেছিল। উভয় দেশই নিজস্ব যুদ্ধবিমান তৈরি করতে চেয়েছিল। আশির দশকে দুই দেশই উচ্চাকাঙ্ক্ষী সামরিক জেট ইঞ্জিন কর্মসূচি চালু করে এবং সোভিয়েত ও পরে রুশ প্রযুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল।
কিন্তু আজ, চার দশক পরে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, দুই দেশের গন্তব্য এক নয়।
চীন এখন শত শত পঞ্চম প্রজন্মের জে-২০ স্টেলথ যুদ্ধবিমান পরিচালনা করছে, নৌবাহিনীর জন্য জে-৩৫ প্রস্তুত করছে এবং নিজস্ব টার্বোফ্যান ইঞ্জিন দিয়ে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে ফেলছে। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশটি বছরে শতাধিক জে-২০ উৎপাদন করছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম উড়োজাহাজ নির্মাতাদের উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে পাল্লা দেয়।
অন্যদিকে ভারত সফলভাবে তেজস হালকা যুদ্ধবিমানকে বিমানবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করলেও সেটি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ইলেকট্রিকের ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় চার দশক পরও দেশটির নিজস্ব কাবেরী ইঞ্জিন প্রকল্প পূর্ণাঙ্গ সাফল্য পায়নি। একইভাবে ভারতের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এএমসিএ প্রকল্পও এখনো ইঞ্জিন উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
প্রশ্ন হলো, দুই দেশের মধ্যে এত বড় পার্থক্য তৈরি হলো কেন?
উত্তরটি কোনো একক প্রযুক্তিগত সাফল্যে নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, ধারাবাহিক শিল্প বিনিয়োগ এবং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সক্ষমতায়।
অনুকরণ থেকে উদ্ভাবনে
নব্বইয়ের দশকের শুরুতেও চীনের বিমানবাহিনীকে খুব শক্তিশালী মনে করা হতো না। তখন তাদের বহরে ছিল মূলত সোভিয়েত যুগের মিগ-১৯ ও মিগ-২১-এর উন্নত সংস্করণ।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তখন এফ-১৫, এফ-১৬, এফ/এ-১৮, এফ-১১৭, বি-২-এর মতো আধুনিক যুদ্ধবিমান পরিচালনা করছিল এবং এফ-২২ তৈরির পথে এগোচ্ছিল।
এই ব্যবধান বুঝতে পেরে চীন কোনো শর্টকাট খুঁজেনি। বরং প্রজন্মব্যাপী শিল্প উন্নয়নের কৌশল গ্রহণ করে।
প্রথম বড় সাফল্য আসে জে-১০ যুদ্ধবিমান দিয়ে। এরপর আসে জে-২০ এবং পরে জে-৩৫। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পর একাধিক পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরিতে সক্ষম তৃতীয় দেশে পরিণত হয় চীন।
এই বিমানগুলো হয়তো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের এফ-২২-এর সমতুল্য নয়। স্টেলথ প্রযুক্তি, ইঞ্জিন কিংবা অ্যাভিওনিক্স নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু চীনের লক্ষ্য শুরু থেকেই নিখুঁত হওয়া ছিল না; লক্ষ্য ছিল ধারাবাহিক উন্নতি।
আজ পরিস্থিতি এমন যে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্পগুলোও অনেকাংশে চীনের দ্রুত অগ্রগতির প্রতিক্রিয়ায় এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আসল যুদ্ধ ছিল ইঞ্জিন প্রযুক্তিতে
একটি যুদ্ধবিমান তৈরি করা কঠিন, কিন্তু তার ইঞ্জিন তৈরি করা আরও অনেক বেশি কঠিন।
আধুনিক সামরিক টার্বোফ্যান ইঞ্জিনের জন্য প্রয়োজন অত্যাধুনিক ধাতুবিদ্যা, বায়ুগতিবিদ্যা, সূক্ষ্ম উৎপাদন প্রযুক্তি, কম্পিউটারভিত্তিক নকশা এবং উচ্চ তাপমাত্রাসহনশীল বিশেষ উপাদান।
১৯৮৬ সালে ভারত ও চীন প্রায় একই সময়ে নিজস্ব ইঞ্জিন উন্নয়নের কাজ শুরু করে।
চীনের প্রথম দিকের ডব্লিউএস-১০ ইঞ্জিন ছিল ব্যর্থ। অনেক ক্ষেত্রে মাত্র কয়েক ঘণ্টা উড্ডয়নের পরই তা মেরামতের প্রয়োজন হতো। বিমানবাহিনী তা গ্রহণ করত না। অনেক দেশ হলে হয়তো প্রকল্পটি বন্ধ করে দিত। চীন তা করেনি।
২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে 'টু ইঞ্জিনস' কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে তারা। উন্নত ধাতুবিদ্যা, উৎপাদন প্রযুক্তি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও পরীক্ষাগারে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি ব্যর্থতাকে তারা অপমান নয়, শিক্ষার অংশ হিসেবে দেখেছে।
ভারতও একই ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল।
কাবেরী ইঞ্জিন কাঙ্ক্ষিত শক্তি অর্জন করতে পারেনি। উন্নত টার্বাইন প্রযুক্তি, উচ্চচাপ কম্প্রেসর এবং বিশেষ ধাতব উপাদান তৈরির ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে ভারতীয় বিমানবাহিনী বাস্তব প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে তেজসের জন্য বিদেশি ইঞ্জিন ব্যবহারই হয়ে ওঠে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
স্বল্পমেয়াদে এটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় ইঞ্জিন শিল্পের বিকাশকে ধীর করে দেয়।
প্রযুক্তি হস্তান্তর অনেক কিছু শেখাতে পারে, কিন্তু কয়েক দশকের উৎপাদন অভিজ্ঞতা, গবেষণা এবং শিল্প সংস্কৃতি কখনোই শুধু নকশা হাতে পেলেই তৈরি হয় না।
শুধু নকল করেই চীন সফল হয়নি
অনেকেই বলেন, চীনের সাফল্যের মূল রহস্য 'রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং'।
এতে কিছুটা সত্যতা থাকলেও এটিই পুরো ব্যাখ্যা নয়।
বিদেশি প্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে একটি যন্ত্রের নকশা বোঝা সম্ভব, কিন্তু উন্নত ধাতুবিদ্যা, নির্ভুল উৎপাদন, পরীক্ষার অবকাঠামো এবং নির্ভরযোগ্য শিল্পব্যবস্থা তৈরি করা যায় না।
চীনের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার।
২০১৬ সালে তারা অ্যারো ইঞ্জিন করপোরেশন অব চায়না (এইইসিসি) প্রতিষ্ঠা করে। এর মাধ্যমে গবেষণা, উৎপাদন ও উন্নয়নকে এক ছাতার নিচে আনা হয়।
ভারতের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সীমিত বেসরকারি অংশগ্রহণের মধ্যে দায়িত্ব বিভক্ত থাকায় সমন্বয় তুলনামূলকভাবে ধীরগতির।
তেজস প্রকল্প ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা তৈরি করেছে। বেসরকারি শিল্প প্রতিরক্ষা খাতে প্রবেশ করছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মহাকাশ খাতেও ভারতের সক্ষমতা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পাচ্ছে।
এখন একই ধরনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ যুদ্ধবিমান শিল্পেও প্রয়োজন।
ফ্রান্সের সাফরান ও যুক্তরাজ্যের রোলস-রয়েস বর্তমানে ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। এটি শুধু একটি ইঞ্জিন কেনার বিষয় নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ দেশীয় ইঞ্জিন শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ। তবে প্রযুক্তি হস্তান্তরই যথেষ্ট নয়।
গবেষণা, পরীক্ষা, ব্যর্থতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, সবকিছুর প্রতি সমান প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে।
ভারত ও চীনের এই তুলনা প্রকৌশলীদের দক্ষতার নয়।
বরং এটি দেখায়, কোন দেশ কতটা ধৈর্য নিয়ে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে এবং ব্যর্থতার মধ্যেও লক্ষ্যে অবিচল থাকতে পারে।
চীন ব্যর্থতাকে প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার মূল্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। ভারত অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত কার্যকর সমাধানের জন্য আমদানির পথ বেছে নিয়েছে।
এখন ভারতের সামনে নতুন এক সন্ধিক্ষণ। আগামী কয়েক বছরে এএমসিএ, তেজস মার্ক-২ এবং দেশীয় ইঞ্জিন উন্নয়ন নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় যুদ্ধবিমান ক্রেতা হিসেবেই থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে নিজস্ব প্রযুক্তিতে যুদ্ধবিমান নকশা, নির্মাণ ও শক্তি জোগাতে সক্ষম কয়েকটি দেশের কাতারে যোগ দেবে।
ইতিহাস বলে, মহাকাশ ও বিমান প্রযুক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব আসে ব্যর্থতা এড়িয়ে নয়, বরং প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।
সূত্র: এনডিটিভি
ভিওডি বাংলা/এমএস








মন্তব্য