তিন দিন সাগরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ফিরলেন আল আমিন

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার জেলে আল আমিন হাওলাদারের কাছে গত কয়েকটি দিন যেন এক দুঃস্বপ্ন। উত্তাল বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ট্রলারডুবির ঘটনায় তিন দিন ধরে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছেন। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ঢেউ আর নিঃসঙ্গতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত জীবিত ফিরে এসেছেন পরিবারের কাছে।
বুধবার (৮ জুলাই) সন্ধ্যায় ভোলার ঢালচর নদসংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় জেলেদের হাতে উদ্ধার হওয়ার পর তাঁকে প্রথমে চরফ্যাশনে নেওয়া হয়। পরে বৃহস্পতিবার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকার কারণে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় বর্তমানে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। আল আমিন (৪২) গলাচিপা উপজেলার ইছাদী গ্রামের বাসিন্দা।
যেভাবে ডুবে যায় ট্রলার
আল আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত রোববার রাত প্রায় ১০টার দিকে পায়রা সমুদ্রবন্দরের পূর্ব-দক্ষিণে গভীর বঙ্গোপসাগরে তাঁদের মাছ ধরার ট্রলারটি অবস্থান করছিল। সবাই জাল ফেলতে ব্যস্ত ছিলেন। ঠিক সেই সময় হঠাৎ আবহাওয়া খারাপ হয়ে প্রবল ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই বিশাল ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি উল্টে যায়।
ট্রলারে মোট ১১ জন মাঝিমাল্লা ছিলেন। আল আমিন, ট্রলারের মালিক এমাদুল সিকদার, হারুন মিয়া, আকাশ, রাকিব, শাকিল, নাজমুল ও বায়জীদ তখন ট্রলারের বাইরে থাকায় দ্রুত পানিতে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। কিন্তু ফোরকান হাওলাদার, তার ছেলে সায়েম এবং পানপট্টি এলাকার এবাদুল কেবিনে থাকায় বের হওয়ার সুযোগ পাননি।
ট্রলার ডুবে যাওয়ার পর প্রথম দিকে কয়েকজন একসঙ্গে ভেসে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু উত্তাল ঢেউ তাঁদের আলাদা করে দেয়।
আল আমিন জানান, প্রথমে এমাদুল, নাজমুল, বায়জীদ, শাকিল ও রাকিব তাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। পরে তিনি, হারুন ও আকাশ ডুবে যাওয়া ট্রলারের একটি অংশ এবং একটি ফিশিং বয়া ধরে ভেসে ছিলেন।
সমুদ্রের বিশাল ঢেউ তাদের জন্য প্রতিটি মুহূর্তকে আরও কঠিন করে তুলছিল। কখনো ট্রলারের ভাঙা অংশ, কখনো ছোট একটি বয়া-এসবই ছিল তাঁদের বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা।
আল আমিন জানান, ট্রলারডুবির দুই দিন পর উল্টে থাকা ট্রলারের কেবিন থেকে ফোরকান হাওলাদার ও এবাদুলের মরদেহ ভেসে বের হতে দেখেন তিনি। এ দৃশ্য তাঁর কাছে ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্ত।
তিনি বলেন, মরদেহ দু’টি ঢেউয়ের সঙ্গে দূরে ভেসে যেতে দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু পরে নিজেকে সামলে আবার বেঁচে থাকার লড়াইয়ে মন দেন। কারণ তখন তাঁর সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারুন ও আকাশের সঙ্গ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন আল আমিন। এরপর সম্পূর্ণ একা হয়ে যান তিনি। একটি ছোট বয়াই হয়ে ওঠে জীবনরক্ষাকারী।
একটি ছোট ফিশিং বয়া পেটের নিচে চেপে ধরে টানা তিন দিন ভেসে ছিলেন। এ সময় তাঁর কাছে কোনো খাবার কিংবা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ছিল না। অনাহারে ও তীব্র পিপাসায় দুর্বল হয়ে পড়েন তিনি। লবণাক্ত পানি শরীরে ঢুকে অসুস্থ হয়ে যান।
তিনি বলেন, একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল আর বাঁচবেন না। কয়েকবার জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থাও হয়েছিল। তবু শেষ শক্তিটুকু দিয়ে বয়াটি আঁকড়ে ধরে ছিলেন।
ভাসতে ভাসতে বুধবার সন্ধ্যায় তিনি ভোলার ঢালচর নদসংলগ্ন এলাকায় পৌঁছে যান। সেখানে মাছ ধরছিলেন স্থানীয় জেলে দুলাল মাঝি ও তাঁর সহযোগীরা। তাঁরা আল আমিনকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান।
পরে তাঁকে চরফ্যাশনে নেওয়া হয়। সেখান থেকে প্রশাসনের সহায়তায় পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হয়।
গলাচিপা উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বর্তমানে আল আমিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
গলাচিপার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুজর মো. ইজাজুল হক জানান, দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকার কারণে আল আমিনের শারীরিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে তাঁর চিকিৎসা চলছে।
জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী জানান, ট্রলারডুবির পর সোমবার এমাদুল সিকদার, নাজমুল, শাকিল, বায়জীদ ও রাকিবকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
এরপর বুধবার সন্ধ্যায় আল আমিনকে উদ্ধার করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এ দুর্ঘটনার পর এখনো পাঁচজনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাঁরা হলেন হারুন, আকাশ, ফোরকান, সায়েম ও এবাদুল।
যদিও আল আমিন দাবি করেছেন, তিনি ফোরকান ও এবাদুলের মরদেহ সাগরে ভেসে যেতে দেখেছেন। তবে তাঁদের মরদেহ এখনো উদ্ধার হয়নি।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধার হওয়া ও নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের খোঁজ নেওয়া হয়েছে। তাঁদের আর্থিক সহায়তা এবং খাদ্যসামগ্রীও দেওয়া হয়েছে।
ইউএনও আবুজর মো. ইজাজুল হক জানান, নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় জেলেদেরও অনুসন্ধান কার্যক্রমে অংশ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
ভিওডি বাংলা/জা








মন্তব্য