• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে এগোচ্ছে সরকার

বগুড়া প্রতিনিধি    ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৮ পি.এম.
ছবি: ভিওডি বাংলা
ছবি: ভিওডি বাংলা

উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য এখন শুধু দেশের বাজারেই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির জন্য সমন্বিত কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ের কার্যক্রম এগিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। আর এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়াকে ঘিরে কৌশলগত কৃষিপণ্য রপ্তানি হাব গড়ে তোলার সম্ভাবনা সামনে এসেছে। সম্ভাব্য স্থান নির্বাচন, কৃষিপণ্যের উদ্বৃত্ত উৎপাদন, যোগাযোগ অবকাঠামো ও রপ্তানি সক্ষমতা নিয়ে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) মতামতের ভিত্তিতে এ পর্যালোচনা করা হয়।
পর্যালোচনায় বগুড়া, রাজশাহী, জয়পুরহাট, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ , নাটোর ও গাইবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলের কৃষিপ্রধান জেলাগুলোর উৎপাদন ও যোগাযোগব্যবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব জেলার কৃষিপণ্য দ্রুত সংগ্রহ করে একটি সমন্বিত রপ্তানি অবকাঠামোর আওতায় আনা গেলে উত্তরাঞ্চল দেশের অন্যতম বৃহৎ কৃষিপণ্য রপ্তানি কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

কেন বগুড়া, কেন তালোড়া?
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর , আরডিএ’র মতে, উত্তরাঞ্চলের কৃষিপ্রধান জেলাগুলোর তুলনামূলক অবস্থান, রেল ও সড়ক যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য বিমান কার্গো সুবিধা বিবেচনায় বগুড়া একটি কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে।

রাজশাহী, জয়পুরহাট, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ , নাটোর ও গাইবান্ধাসহ আশপাশের জেলার কৃষিপণ্য বগুড়ায় আনার ক্ষেত্রে সড়ক ও রেল যোগাযোগের সুবিধা রয়েছে। ফলে কৃষিপণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।  

বিশেষ করে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়া রেলস্টেশন-সংলগ্ন এলাকায় এই সম্ভাবনা রয়েছে । তালোড়া থেকে বগুড়া বিমানবন্দরের দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার ফলে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন কৃষিপ্রধান জেলা থেকে পণ্য সংগ্রহ করে রেল ও সড়কপথে তালোড়ায় এনে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পরবর্তী সময়ে বিমান কার্গোর মাধ্যমে দ্রুত রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

বগুড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হলে কার্গো সুবিধা চালু করার কথা রয়েছে । এতে আম, টমেটো, কাঁচা মরিচ, শাকসবজি ও অন্যান্য দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্য ও কৃষি যন্ত্রপাতি আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেল-সড়ক-নদীপথ, সঙ্গে  বিমান কার্গো
বগুড়াকে ঘিরে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অন্যতম বড় যুক্তি হিসেবে উঠে আসছে বহুমুখী যোগাযোগব্যবস্থা।
রেলপথে কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য বিশেষায়িত মালগাড়ি বা কার্গো সুবিধা চালু করা গেলে কম খরচে বড় পরিমাণ পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে। সড়কপথে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষিপণ্য দ্রুত বগুড়ায় আনা যাবে।

অন্যদিকে, বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে নদীপথে পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনাও রয়েছে। ভবিষ্যতে এ যোগাযোগব্যবস্থা কার্যকর করা গেলে রেল, সড়ক, নদীপথ এবং বিমান কার্গো-চার ধরনের পরিবহন সুবিধাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বহুমুখী যোগাযোগব্যবস্থার এ সুবিধা তালোড়াকে উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য রপ্তানি হাব হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব দিচ্ছে।

তিন ফসলি জমি রক্ষা করে শিল্পায়ন

কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জমি নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বগুড়ার পূর্বাঞ্চল গাবতলী এলাকায় বন্যার পানি ও কৃষিজমি ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য জমি তিন ফসলি। আবার কাহালু, দুপচাঁচিয়া ও আদমদীঘির বিভিন্ন এলাকায়ও তিন ফসলি জমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য।

এ অবস্থায় রেলস্টেশন-সংলগ্ন অপেক্ষাকৃত কম উৎপাদনশীল বা এক ফসলি জমি নির্বাচন করে কৃষিপণ্যভিত্তিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পক্ষে মত দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, তালোড়া রেলস্টেশন-সংলগ্ন এলাকায় পরিকল্পিতভাবে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল গড়ে তোলা হলে কৃষিজমি রক্ষা এবং শিল্পায়নের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সম্ভব হতে পারে।

শহরের চাপ কমিয়ে পরিকল্পিত শিল্পায়নও
বগুড়া শহরের আশপাশে বড় ধরনের শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলে জমির সংকট  বাড়তে পারে। একই সঙ্গে শহর ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে নাগরিক চাপ ও পরিবেশগত ঝুঁকি বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে।

তাই শহর থেকে কিছুটা দূরে, তুলনামূলক নিরিবিলি পরিবেশে তালোড়াকে ঘিরে কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার ধারণাকে বাস্তবসম্মত মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, তালোড়ায় কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল গড়ে উঠলে একদিকে বগুড়া শহরের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে, অন্যদিকে রেলপথ ও সম্ভাব্য বিমান কার্গো সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে একটি পরিকল্পিত কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
প্রস্তাবিত কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, প্যাকেজিং ও লেবেলিং সেন্টার, মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার, কৃষক সংগ্রহ কেন্দ্র, রেল কার্গো টার্মিনাল, কনটেইনার সুবিধা, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু হলে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলে আলু, আম, ধান, ভুট্টা, শাকসবজি, টমেটো, কাঁচা মরিচ, লিচু, পান, সুগন্ধি চাল ও পাটের বিপুল উৎপাদন হয়। এসব কৃষিপণ্য মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, নেপাল, ভুটান, চীন, জাপান, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু জমি নির্বাচন করলেই কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল সফল হবে না। আন্তর্জাতিক মানের কোল্ড চেইন, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, প্যাকেজিং ও লেবেলিং, মান নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার, কৃষক সংগ্রহ কেন্দ্র, রেল কার্গো টার্মিনাল, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ শেষে তালোড়াকে কেন্দ্র করে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা গেলে এটি শুধু বগুড়ার নয় উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য একটি যৌথ রপ্তানি অবকাঠামোতে পরিণত হতে পারে।

আর এর মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।
 

ভিওডি বাংলা/আ.স.ম. জাকারিয়া/জা


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ছবি: ভিওডি বাংলা
জয়েনপুর আদর্শ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে মাউশির শোকজ
ছবি-ভিওডি বাংলা
তদন্তে মেলেনি সেতু নির্মাণে অনিয়মের প্রমাণ
ছবি-ভিওডি বাংলা
ইচ্ছেমতো চলাই স্বাধীনতা নয়