স্পেনের জয়ের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা অজানা গল্প

২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই আসরকে ফুটবলের বৈশ্বিক সম্প্রসারণের নতুন যুগ হিসেবে তুলে ধরেছিল ফিফা। টুর্নামেন্টের শেষ পর্যন্ত স্পেন শিরোপা জিতলেও, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে মাঠের ফুটবল নয়; বরং রাজনীতি, বাণিজ্যিক স্বার্থ, ভিসা জটিলতা, ব্যয়বহুল আয়োজন এবং ফিফার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, স্পেনের শিরোপা জয় যতটা স্মরণীয়, তার চেয়েও বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজন এবং পরিচালনা।
বিশ্বকাপের অন্যতম বড় সমালোচনা ছিল ম্যাচ দেখার ব্যয়। আগের যেকোনো আসরের তুলনায় টিকিটের দাম ছিল অনেক বেশি। এর সঙ্গে যোগ হয় হোটেল, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ। অনেক শহরে ম্যাচের সময় আবাসন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
সমালোচকদের মতে, বিশ্বকাপ ধীরে ধীরে সাধারণ সমর্থকদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, করপোরেট অতিথি, ভিআইপি দর্শক এবং বাণিজ্যিক অংশীদারদের জন্য সুযোগ বাড়াতে গিয়ে ঐতিহ্যবাহী ফুটবল সমর্থকদের গুরুত্ব কমে গেছে।
এই বিশ্বকাপে একাধিক ঘটনা দেখিয়েছে যে আন্তর্জাতিক ফুটবলও বৈশ্বিক রাজনীতি থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়।
আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের বর্ষসেরা রেফারি সোমালিয়ার ওমর আরতান বৈধ ভ্রমণ নথি থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। শেষ পর্যন্ত ফিফাও তার জন্য কোনো সমাধান করতে পারেনি।
অন্যদিকে ইরানের জাতীয় দলকে ভিসা ও ভ্রমণসংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে মেক্সিকোর তিহুয়ানাকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। ম্যাচ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আবার দ্রুত ফিরে আসতে হওয়ায় খেলোয়াড়দের বিশ্রাম ও প্রস্তুতিতে প্রভাব পড়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কতটা রাজনৈতিক বাস্তবতার বাইরে থাকতে পারে, সেই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক:
বিশ্বকাপ চলাকালে সবচেয়ে আলোচিত বিতর্কগুলোর একটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনকে ঘিরে।
রাউন্ড অব ৩২-এর এক ম্যাচে লাল কার্ড দেখার পর নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী ম্যাচে তার নিষিদ্ধ থাকার কথা ছিল। কিন্তু পরে ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি সেই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে, ফলে তিনি রাউন্ড অব ১৬-তে খেলতে পারেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। যদিও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়, ইউরোপের বিভিন্ন ফুটবল মহল প্রশ্ন তোলে—ফিফা কি সত্যিই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পেরেছে?
বড় হয়ে উঠল বিনোদন:
বিশ্বকাপের আয়োজনেও দেখা যায় একাধিক নতুন পরিবর্তন।
প্রচণ্ড গরমের কারণে একাধিক ম্যাচে বাধ্যতামূলক 'কুলিং ব্রেক' রাখা হয়। পাশাপাশি সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের সুবিধা বিবেচনায় ম্যাচের সময়সূচিও নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয় ফাইনালের বিরতি নিয়ে। প্রচলিত ১৫ মিনিটের পরিবর্তে প্রায় আধাঘণ্টা বিরতি দিয়ে বিশাল আকারের সংগীতানুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। অনেক সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষকের মতে, এতে ফুটবলের ঐতিহ্য ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং উত্তর আমেরিকার ক্রীড়া-বিনোদন মডেল বিশ্বকাপে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যৎ কোন পথে:
২০২৬ বিশ্বকাপ নিঃসন্দেহে আয়োজনে নতুন দিগন্ত খুলেছে। ৪৮ দলের অংশগ্রহণ বিশ্বকাপকে আরও বৈশ্বিক করেছে এবং অনেক নতুন দেশকে সর্বোচ্চ মঞ্চে খেলার সুযোগ দিয়েছে।
তবে একই সঙ্গে এই আসর দেখিয়েছে, অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সম্প্রচারকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত ফুটবলের ঐতিহ্যকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের বিশ্বকাপগুলোতে ফুটবলের মূল চেতনাকে অক্ষুণ্ন রাখতে হলে ফিফাকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে দূরে থাকা, আয়োজনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ সমর্থকদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
স্পেনের শিরোপা জয় ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কিন্তু ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ হয়তো শুধু নতুন এক বিশ্বচ্যাম্পিয়নের জন্য নয়, বরং এমন এক আসর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, যেখানে মাঠের ৯০ মিনিটের ফুটবলের চেয়েও বেশি আলোচনায় ছিল রাজনীতি, অর্থনীতি এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ।
সূত্র: এনডিটিভি
ভিওডি বাংলা/এমএস








মন্তব্য