হাতিয়ায় সেই ‘ধর্ষণকাণ্ডের’ ঘটনায় ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা

নোয়াখালীর হাতিয়ায় ধর্ষণ অভিযোগে আলোচিত একটি ঘটনায় পাঁচদিন পর অবশেষে ছয়জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগী নারী নিজেই বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলাটি করেন। আদালত অভিযোগ গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট থানাকে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) ভুক্তভোগী নারী (৪০) নোয়াখালী জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেন। শুনানি শেষে বিচারক হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) মামলা রুজু করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
মামলায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা সবাই হাতিয়ার চানন্দী ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাসিন্দা। অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা সংঘবদ্ধভাবে হামলা, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টার পর একটি নির্বাচনী প্রতীকে ভোট দেওয়া নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে একদল লোক ধানসিঁড়ি আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় হামলা চালায়। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, আসামিরা অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে ভুক্তভোগীর বসতঘরে জোরপূর্বক প্রবেশ করে। সেখানে ভুক্তভোগী ও তার স্বামীকে মারধর করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, এক পর্যায়ে স্বামীকে আলাদা কক্ষে আটকে রেখে প্রধান আসামি ভুক্তভোগী নারীর ওপর জোরপূর্বক নির্যাতন চালান। ঘটনার পর বিষয়টি প্রকাশ করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগে আরও বলা হয়, পরদিন ভোরে একই ব্যক্তিরা আবারও ওই এলাকায় গিয়ে ভুক্তভোগী দম্পতির ওপর হামলা চালায় এবং মারধর করে। এ সময় আরও একজন নারী কর্মীর বাড়ি দেখিয়ে দিতে চাপ সৃষ্টি করা হয়। সংশ্লিষ্ট বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পরদিন, ১৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ভুক্তভোগী নারীকে নোয়াখালীর ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন আছেন এবং তাকে পুলিশি পাহারায় রাখা হয়েছে। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তার শারীরিক পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. নোমান সিদ্দিক গণমাধ্যমকে জানান, আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানাকে দ্রুত মামলা রুজু করার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগীর চিকিৎসার জন্য তিন সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, পুলিশের অনুরোধের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে এবং চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা হলেন—গাইনি বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকরা।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আলামত সংগ্রহ ও পরীক্ষার অংশ হিসেবে ডিএনএ পরীক্ষা করা হচ্ছে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে এক সপ্তাহের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্রতিবেদন মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন বলেন, আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর মামলাটি রুজু করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মামলার কপি হাতে পেলেই তদন্ত কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তাকে সার্বক্ষণিক পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হয়েছে এবং যেকোনো ধরনের ঝুঁকি এড়াতে স্থানীয় পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। মামলার তদন্ত ও মেডিকেল রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ভিওডি বাংলা/জা







