সাব-ঠিকাদারের দৌরাত্ম্যে থমকে আছে রাজারহাট-আনন্দবাজার সড়ক

কুড়িগ্রামের রাজারহাট থেকে আনন্দবাজার পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির সংস্কার কাজ দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে রয়েছে। ফলে ২০টি গ্রামের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। পাঁচ বছর ধরে কার্পেটিং উঠে ছোট-বড় গর্ত ও খানাখন্দে ভরা সড়কটি এখন কার্যত চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজারহাট-আনন্দবাজার সড়ক পাকাকরণের কাজ শুরুর দুই মাসের মাথায়ই কাজ বন্ধ করে দেয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। একাধিকবার প্রকল্পটি সাব-ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করায় নির্ধারিত সময় পার হলেও কাজের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ফলে দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে গিয়ে কাজ বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। সড়কের বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত খোঁড়া অবস্থায় পড়ে আছে। উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ দাবি করছে, কাজ ধীরগতিতে চলমান রয়েছে। কোথাও আবার পুরনো ইট-পাথর ও সাববেজ উল্টে রাখা হয়েছে। পুরো সড়কের মাঝখানজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গর্ত ও খানাখন্দ।
জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর অধীনে রুরাল কানেকটিভিটি ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (আরসিআইপি) আওতায় ২০২৩ সালে ১৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৬ হাজার ১০ টাকায় প্রকল্পটির চুক্তি সম্পন্ন হয়। কাজটি পান রংপুরের ঠিকাদার খায়রুল কবির রানা। পরবর্তীতে তিনি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর হারিশুল বাড়ির রনি নামের এক সাব-ঠিকাদারের কাছে প্রকল্পটি হস্তান্তর করেন। রনি আবার আবুশামা নামের আরেক সাব-ঠিকাদারের কাছে কাজটি দেন।
২০২৪ সালের শেষের দিকে সাব-ঠিকাদার আবুশামা কাজ শুরু করলেও অসমাপ্ত রেখে সরে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ২৪ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জানুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অথচ ঠিকাদার কাজের বিপরীতে দুই দফায় প্রায় দেড় কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, কাজের শুরুতেই সড়কের দুই পাশে মাটি কেটে বড় বড় গর্ত তৈরি করা হয়। কিছু অংশে খোয়া উল্টে রেখে দেওয়া হয়েছে। এরপর কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সড়কটি আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। গত দুই বছর ধরে এই সড়ক দিয়ে স্বাভাবিকভাবে যান চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে।
চাকিরপশার তালুক গ্রামের বাসিন্দা আশরাফুল আলম বলেন, “সড়কটির এই অবস্থার কারণে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসসহ কোনো জরুরি সেবা দ্রুত পৌঁছাতে পারে না। স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা অটোরিকশা বা ভ্যানে করে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে থাকে। ইতোমধ্যে কয়েকটি অটোরিকশা দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া-আসা কিংবা অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে এলাকাবাসী চরম বিপদে পড়ছেন। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি বেহাল থাকলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।
উমরমজিদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আহসানুল কবির আদিল ও চাকিরপশার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম জানান, দীর্ঘদিন ধরে সড়কের কাজ বন্ধ রয়েছে। তারা বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অবহিত করেছেন।
সাব-ঠিকাদার রনি বলেন, “এর আগে ঠিকাদার আবুশামা কাজটি করছিলেন। এখন আমি করছি। তবে আমি নিজে সাইটে যাইনি। ম্যানেজার দেখভাল করছে। কী অবস্থা, তা সঠিকভাবে জানি না। কাজের সময় আগামী ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।”
রাজারহাট উপজেলা প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার বলেন, “আমি সদ্য যোগদান করেছি। বিষয়টি বিস্তারিত জানা নেই। তবে সম্ভবত কাজের সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল ইমরান বলেন, “বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা সভায় একাধিকবার উত্থাপন হয়েছে। উপজেলা প্রকৌশলী জানিয়েছেন কাজ চলমান রয়েছে। জেলা প্রশাসকও বিষয়টি অবগত আছেন।”
কুড়িগ্রাম এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী আবু তৈয়ব সরকার বলেন, “মূল ঠিকাদারকে কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য বারবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবুও কাজের গতি সন্তোষজনক নয়।”
এদিকে এলাকাবাসীর আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে আগামী দুই বছরেও সড়কটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হবে না। দ্রুত কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে তারা মনে করছেন।
ভিওডি বাংলা-প্রহলাদ মন্ডল সৈকত/জা







