‘বার্গার বাবু’র উত্থান
ফুটপাত থেকে অপরাধ জগতে

রাজধানীর ধানমন্ডি, কলাবাগান, মোহাম্মদপুর এলাকার ফুটপাতে একসময় যারা নিয়মিত আড্ডা দিতেন, তাদের অনেকেই হয়তো তার হাতের বার্গার খেয়েছেন। বাইরে থেকে দেখলে সাদাসিধা একজন ভাসমান হকার। কিন্তু এই নিরীহ চেহারার আড়ালেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল এক ভয়ঙ্কর অপরাধী সত্তা। তিনি মো. জাহিদুল ইসলাম বাবু, তবে ঢাকার অপরাধ জগতে তার পরিচয় ‘বার্গার বাবু’ নামে।
শনিবার (৭ মার্চ) রাতে ধানমন্ডির শেখ জামাল মাঠের পাশ থেকে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর এই বার্গার বাবুর আমলনামা ঘেঁটে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। একজন সাধারণ পথ-খাবার বিক্রেতা কীভাবে ছিনতাই ও মাদকের ডন হয়ে উঠলেন, তার নেপথ্যের গল্পটি যেন সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।
যেভাবে তিনি হয়ে উঠলেন বার্গার বাবু:
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার বাহেরপুর গ্রাম থেকে ভাগ্য বদলের আশায় ঢাকায় এসেছিলেন শুক্কুর শিকদারের ছেলে জাহিদুল। থাকার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা ছিল না, কলাবাগান মাঠ এলাকায় ভাসমান জীবনযাপন করতেন। জীবন বাঁচাতে ধানমন্ডি ও আশেপাশের এলাকার ফুটপাতে শুরু করেন বার্গার বিক্রি। তার বানানো বার্গার স্থানীয় তরুণদের কাছে বেশ পরিচিতি পায়, আর সেখান থেকেই তার নামের সাথে জুড়ে যায় ‘বার্গার’ শব্দটি। বাবু হয়ে যান ‘বার্গার বাবু’।
কিন্তু ফুটপাতের এই জীবন তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় শহরের অন্ধকার জগতের সাথে। বার্গার বিক্রির আড়ালে এলাকার মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারী চক্রের সাথে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। অল্প পরিশ্রমে বেশি টাকার লোভে তিনি জড়িয়ে পড়েন অপরাধে। বার্গার বিক্রির কার্ট বা ভ্যানটি একসময় পরিণত হয় মাদক হাতবদলের নিরাপদ বাহনে। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বার্গার বিক্রি ছেড়ে তিনি পুরোপুরি নাম লেখান ছিনতাই ও মাদকের সিন্ডিকেটে।
অপরাধের লম্বা খতিয়ান:
পুলিশের নথিপত্র এবং আদালতে পাঠানো প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বার্গার বাবুর অপরাধের হাতেখড়ি মূলত মাদকের মাধ্যমে। ২০১৮ সালের জুলাই এবং ডিসেম্বর মাসে মোহাম্মদপুর থানায় তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা (এফআইআর নং-৪৭ ও ৭৯) দায়ের হয়।
মাদকের কারবার করতে গিয়েই তিনি ছিনতাই চক্রের সাথে যুক্ত হন। ২০২১ সালে তার অপরাধের ধরন পাল্টাতে থাকে। ওই বছরের মার্চ মাসে ধানমন্ডি থানায় চুরির মামলা এবং মোহাম্মদপুর থানায় দস্যুতার চেষ্টার (পেনাল কোড ৩৯৩) মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। ২০২৩ সালে আবারও মোহাম্মদপুর থানায় মাদকের মামলায় (এফআইআর নং-৬৩) পুলিশের খাতায় নাম ওঠে তার।
দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে তিনি ধানমন্ডি, কলাবাগান ও মোহাম্মদপুর এলাকায় নিজের একটি চক্র গড়ে তুলেছিলেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, বাবু একজন তালিকাভুক্ত অপরাধী। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ৭ই মার্চ শনিবার সন্ধ্যা ৭:৪৫ মিনিটে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
আদালতে পুলিশের দেওয়া ফরোয়ার্ডিং রিপোর্ট থেকে জানা যায়, শনিবার রাত ৭:৪৫ মিনিটে ধানমন্ডি ৮ নম্বর সড়কে শেখ জামাল মাঠের পশ্চিম পাশের ফাঁকা রাস্তায় সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করছিলেন বার্গার বাবু। এ সময় ধানমন্ডি মডেল থানার টহল পুলিশের (স্পেশাল হোন্ডা মোবাইল-২২) একটি দল তাকে আটক করে। এত রাতে সেখানে কী করছেন—এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে না পারায় এবং তার অতীত অপরাধের রেকর্ড থাকায় ঢাকা মেট্রোপলিটন অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ এর ৮৬(ঘ)/১০০ ধারায় (সন্দেহজনক ঘোরাফেরা) তাকে তাৎক্ষণিক গ্রেফতার দেখানো হয়।
ধানমন্ডি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ভিওডি বাংলাকে বলেন, কলাবাগান মাঠ এলাকায় ভাসমান জীবনযাপন করত এই বার্গার বাবু। জীবন বাঁচাতে ধানমন্ডি ও আশেপাশের এলাকার ফুটপাতে শুরু করেন বার্গার বিক্রি। কিন্তু ফুটপাতের এই জীবন তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় শহরের অন্ধকার জগতের সাথে। বার্গার বিক্রির আড়ালে এলাকার মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারী চক্রের সাথে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। অল্প পরিশ্রমে বেশি টাকার লোভে তিনি জড়িয়ে পড়েন অপরাধে। পুলিশের নথিপত্র এবং আদালতে পাঠানো প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বার্গার বাবুর অপরাধের হাতেখড়ি মূলত মাদকের মাধ্যমে। তার বিরুদ্ধে একাধিক চুরি, ছিনতাই ও মাদকের মামলা রয়েছে।
রাজধানীর ভাসমান মানুষদের অনেকেই পেটের দায়ে ছোটখাটো ব্যবসা করেন। কিন্তু জাহিদুল ইসলাম বাবু সেই ভাসমান জীবন ও ফুটপাতের ব্যবসার আড়াল নিয়ে কীভাবে পুরো একটি অপরাধ চক্রের সক্রিয় সদস্য হয়ে উঠলেন, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি নতুন চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভিওডি বাংলা/ইসমাইল/এমএস







