• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে ডিজেল, সীমান্তজুড়ে কড়া নজরদারি

রুদ্র রাসেল    ৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৪ এ.এম.
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জ্বালানি সংকটের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে প্রতিবেশী দেশে পাচার হচ্ছে ডিজেল। এই বাস্তবতায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চল এক অর্থনৈতিক অপরাধের করিডোরে পরিণত হচ্ছে। সাম্প্রতিক একের পর এক অভিযানে সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার ও ডিজেল জব্দের ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, মিয়ানমারে ডিজেল পাচার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম, যা আঞ্চলিক অস্থিরতাকে পুঁজি করে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।

শনিবারও (৪ এপ্রিল) মিয়ানমারে পাচারকালে বিপুল পরিমাণ ডিজেলসহ ১২ পাচারকারীকে আটক করেছে কোস্ট গার্ড। এদের বেশিরভাগ রোহিঙ্গা শরনার্থী। যে ঘটনা বিশ্লেষণ করে কোস্টগার্ডের গোয়েন্দা ইউনিট বলছে, এসব পাচারকাণ্ডে রোহিঙ্গারা জড়িয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিকরা বাংলাদেশ অংশের পরিবহন হাতবদলসহ অন্য অংশ সম্পন্ন করছে এবং রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের পাচারকারী দলের সঙ্গে এদেশের পাচারকারীদের সখ্যতা করে দিচ্ছে। পাচারকৃত জ্বালানি তেল মিয়ানমারে পৌঁছে দেয়ার কাজেও রোহিঙ্গারা সম্পৃক্ত। 

ডিজেল পাচারের অভিযানের অভিজ্ঞতা বর্ননা করে কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, শনিবার সকাল ৬টায় কোস্ট গার্ড চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানাধীন বহিনোঙ্গর এলাকায় সন্দেহজনক ১টি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তল্লাশি চালিয়ে অবৈধভাবে শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে মায়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে বহনকৃত ৬ হাজার লিটার ডিজেল, ৬টি গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডার, নগদ ১৫ হাজার ৮ শত ৯৬ টাকা ও পাচারকাজে ব্যবহৃত বোটসহ ৪ জন বাঙালি ও ৮ জন রোহিঙ্গা পাচারকারী আটক করা হয়। 

ভিওডি বাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গেল বছরের নভেম্বর থেকেই ডিজেল পাচারের বিষয়টি নজরে এসেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ- বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খরা রক্ষাকারী বাহিনীর। ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমারে পাচারকালে ৩০টির বেশি ঘটনায় অন্তত ১০০ জনকে ডিজেলসহ গ্রেপ্তারের তথ্য উঠে এসেছে। 

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন বলছে- বিদেশে পাচারের উদ্দেশ্যেই একটি চক্র ডিজেলসহ জ্বালানি মজুদ করছে। তাদের উদ্দেশ্য দুটি। একটি হচ্ছে- অতিরিক্ত দামে বিক্রি করে অ।বৈধ মুনাফা লাভ করা এবং দেশে অস্থির পরিবেশ সৃষ্টি করা। 

গোপন প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সম্প্রতি দেশে জ্বালানি মজুদকারীদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে যাওয়ায় এবং একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়ায় মজুদকারীরা সীমান্তের ওপারে পাচার করতে সাহস পাচ্ছে না। ওইসব ডিজেল নদীতে পুকুরে এবং গোপন স্থানে তারা মজুদ করে রাখছে- যা ধরা পড়ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হপাতে। মূলত চোরাচালান চক্রটি বছর খানেক ধরে অতিক সক্রিয় হলেও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময়টাতে জ্বালানি সংকট নিয়ে বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হওয়ার সুযোগে অপতৎপরতা আরও বাড়িয়েছে। 

এছাড়া সরবরাহ এবং সরকারি মজুদ ও চাহিদা স্বাভাবিক থাকলেও কেনো টান পড়ছে জ্বালানি তেলে এবং এতো জ্বালানি যাচ্ছে কোথায়- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে মিয়ানমারে পাচার করার দুষ্টু পরিকবল্পনা।  

একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিজেল যাচ্ছে কোথায় বলে যে প্রশ্ন উঠেছে দেশের মধ্যে- তা অনুসন্ধানে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। আর এই পাচার প্রক্রিয়ায় বিজিবির ওপরই দায় বর্তাচ্ছে। যেহেতু সংস্থাটি সীমান্ত পাহাড়ার দায়িত্বে। 

জ্বালানি সংকটের প্রভাবে ক্রান্তিলগ্নে থাকা দেশের এই পরিস্থিতিতে ডিপো, পেট্রোল পাম্প মালিক, বিভিন্ন স্থানে খোলা জ্বালানি বিক্রেতাসহ দেশের সব সীমান্তের পাহাড়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকা করে কড়া নজরদারির প্রয়োজন পড়েছে। 
 
এদিকে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী চ্যানেলের ১৪ নম্বর ঘাট এলাকায় গত ২৯ মার্চ ভোররাতে কোস্ট গার্ডের একটি বিশেষ অভিযানে ৭ জনকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে প্রায় ১,৬০০ লিটার ডিজেল, ৩,৩০০ কেজি টার, চারটি ডিজেল ইঞ্জিন এবং একটি ট্রলার জব্দ করা হয়। জব্দকৃত পণ্যের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪৮ লাখ টাকা। তদন্তে জানা যায়, কর ও শুল্ক ফাঁকি দিয়ে এসব জ্বালানি মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।

এটি সাম্প্রতিক সময়ের একমাত্র ঘটনা নয়।  ভোলা ও চট্টগ্রামের পৃথক অভিযানে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল জব্দ এবং সংশ্লিষ্টদের আটক করার ঘটনা সামনে এসেছে। একইভাবে চট্টগ্রামের সাগর এলাকায় পরিচালিত আরেক অভিযানে ১০ জন পাচারকারীকে আটক করার সময় তাদের কাছ থেকে ২৩০ লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়, যা অন্য পণ্যের সঙ্গে পাচারের জন্য বহন করা হচ্ছিল। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, ডিজেল পাচার এখন বড় চোরাচালান নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে চলমান সংঘাত, প্রশাসনিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ সংকটের কারণে সেখানে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলক কম দামে ডিজেল পাচার করে পাচারকারীরা বড় অঙ্কের লাভ করছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার প্রভাব সীমান্তবর্তী এলাকাতেও পড়ছে। এই পরিস্থিতিই পাচারচক্রকে আরও সক্রিয় করে তুলেছে।

পাচারকারীরা সাধারণত ছোট ট্রলার, মাছ ধরার নৌকা বা কার্গো বোট ব্যবহার করে থাকে, যাতে সহজে নজর এড়ানো যায়। রাতের আঁধার, দুর্গম চরাঞ্চল এবং নদীপথকে কাজে লাগিয়ে তারা সীমান্ত অতিক্রম করে।  অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জেলে বা মাঝিদেরও আর্থিক প্রলোভনে এই কাজে যুক্ত করা হয়। ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার, কর ফাঁকি এবং পণ্য গোপন করে পরিবহন—এসব কৌশল তাদের কার্যক্রমকে আরও সহজ করে তুলছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড উপকূলীয় এলাকায় ২৪ ঘণ্টা টহল জোরদার করেছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে স্থলসীমান্তে বিজিবিও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে, কারণ সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধ তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তবে দীর্ঘ উপকূলরেখা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় সহযোগিতার কারণে পাচার পুরোপুরি বন্ধ করা এখনো কঠিন হয়ে রয়েছে।

ডিজেল পাচারের অর্থনৈতিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় অপরাধচক্রগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যও হুমকি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান বাড়িয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। উপকূলীয় এলাকায় আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি, স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, মিয়ানমারে ডিজেল পাচার এখন একটি সুসংগঠিত ও ক্রমবর্ধমান সংকটে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে এই চক্র আরও বিস্তৃত হচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এটি দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
বাংলাদেশিদের অর্থে ফুলে-ফেঁপে উঠছে সুইস ব্যাংক!
বাংলাদেশিদের অর্থে ফুলে-ফেঁপে উঠছে সুইস ব্যাংক!
ছবি: সংগৃহীত
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরে অপপ্রচার, নেপথ্যে কারা?
ছবি: ভিওডি বাংলা গ্রাফিক্স
আ’লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এনসিপি ও পুলিশের ওপর বড় হামলার শঙ্কায় দেশজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা