• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
টপ নিউজ
ইরানের সর্ববৃহৎ পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনা ধ্বংসের দাবি ইসরায়েলের সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটাতে দিল্লি যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক রাতেই ইরানকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব, মঙ্গলবারই হতে পারে সেই রাত আগামী ২৭ এপ্রিল যশোর সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ঢাকার বাসাবো এলাকায় অভিযান: ৬৫০ লিটার ডিজেল জব্দ ট্রাম্পকে ক্ষমতাচ্যুত করার সম্ভাবনা বাড়ছে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর ঢাকাসহ ১৩ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের সতর্কবার্তা ইরানকে কড়া হুশিয়ারি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংসের ইঙ্গিত ট্রাম্পের জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ উজাড় করে খেলতে চাই: সাকিব আল হাসান

দখল হয়ে গেছে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র

জহির আদনান    ৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪৭ পি.এম.
ফেনী সোনাগাজীর মুহুরী প্রজেক্টে দেশের প্রথম বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবি: ভিওডি বাংলা

ফেনী সোনাগাজীর মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায় স্থাপিত দেশের প্রথম বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধনের ১৯ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কাজে আসেনি। সাড়ে ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ কেন্দ্র বন্ধ রাখার ফলে অযত্নে অবহেলায় নষ্ট হয়েছে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। দখল হয়ে গেছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১০ একর ভূমি। তবে শিগগিরই এই কেন্দ্র উৎপাদনে যাবে এমন কোনো তথ্য নেই জেলার বিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের কাছে।

বিউবো ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সোনাগাজীর উপকূলীয় অঞ্চল মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ২০০৪-২০০৫ অর্থবছরে স্থাপন করে দেশের প্রথম বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র। তখন বলা হয়েছিল সোনাগাজীতে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রায় ৯০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। ভারতের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নেভ্যুলা টেকনো সলুয়েশন লিমিডেটের সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক ৫০ মিটার উঁচু টাওয়ার, ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর, কন্ট্রোল প্যানেল, সাবস্টেশন ও ম্যাচিংগিয়ারসহ প্রয়োজনীয় প্রায় সব সরঞ্জামই ভারত থেকে আনা হয়েছে।

ফেনী নদীর রেগুলেটরের প্রায় ৫০০ গজ দূরে লামছি গ্রামে ২০০৬ সালের শেষের দিকে এ কেন্দ্রে পরীক্ষামূলক উৎপাদনও শুরু করা হয়েছিল। কিছুদিন পর বাতাসের গতিবেগ কম হওয়ায় উৎপাদন কমে গেলে কর্মকর্তারা আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় এটি বন্ধ করে দেন। প্রায় ১৯ বছর পরিত্যক্ত থাকায় অযত্নে অবহেলায় কেন্দ্রটির প্রয়োজনীয় অনেক মালামাল নষ্ট ও চুরি হয়ে গেছে। 

ইতোমধ্যে টাওয়ার ও অন্যান্য লোহার যন্ত্রপাতি মরিচা ধরে অনেকটা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এ ছাড়াও সীমানা প্রাচীর না থাকায় চুরি হয়ে গেছে মোটর ও সংযোগ তারসহ অনেক মূল্যবান যন্ত্রাংশ। একই সঙ্গে ভূমিদস্যু চক্র গত হাসিনা সরকারের সময়কালে ফেনী-২ আসনের বিনা ভোটে নির্বাচিত সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারীর আশীর্বাদে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভূমিতে পুকুর খনন করে মাছের খামার তৈরি করে। ৫ আগস্ট হাসিনা সরকার পতনের পর এসব পুকুর এখন বিএনপি-জামায়াত নেতাদের দখলে। খামারের মাছ বিক্রি করে দখল চক্র কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ফেনী অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী হোসেন মাহমুদ শামীম ফরহাদ জানান, প্যান এশিয়া নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রটি মেরামতের কাজ করেছিল, তাও কোন কাজে আসেনি। এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চার পাশের জমিতে ভূমিখেকো চক্র পুকুর খনন করে মাছ চাষ করছে। বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৪টি টারবাইন পিলার দাঁড়িয়ে আছে মাত্র। তিনি বলেন, এটি ছিল পরীক্ষামূলক প্রকল্প। তাই এ থেকে নতুন কিছু আশা করা ঠিক হবে না।

ফেনী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হোসেন মাহমুদ শামীম ফরহাদ আরও জানান, সোনাগাজীর বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিষয়ে আমাদের কাছে তেমন কোনো তথ্য নেই। এটি প্রধান কার্যালয়ের প্রজেক্ট হওয়ায় ঢাকা থেকে সরাসরি তত্ত্বাবধান করা হয়। তবে কিছুদিন আগে এর মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে বলে আমি জানতে পেরেছি। তাও কোনো কাজে আসেনি। প্রকল্প এলাকা এখন স্থানীয় মস্তানদের দখলে রয়েছে।

সাড়ে চার বছর ধরে অচল দেশের প্রথম বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র
 
ফেনী জেলার সোনাগাজী মুহুরী সেচ প্রকল্প এলাকায় স্থাপিত দেশের প্রথম বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দীর্ঘ চার বছরের বেশি সময় ধরে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। জনবল সংকট, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সাড়ে সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই কেন্দ্রটি এখন অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে।

তার চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির জমি দখল করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ভূমিদস্যুদের একটি সিন্ডিকেট, যারা ভুয়া দলিলপত্র দেখিয়ে এলাকা দখলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

২০০৪–০৫ অর্থবছরে ডেনিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (DANIDA)-এর অর্থায়নে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) সোনাগাজীর মুহুরী সেচ প্রকল্প এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এ বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করে। প্রকল্পের অধীনে ২২৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার চারটি উইন্ড টারবাইন বসানো হয়, যার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ০.৯ মেগাওয়াট।

নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে ভারতের নেবুলা টেকনো সল্যুশন লিমিটেড। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে পরীক্ষামূলক সফলতা অর্জন এবং ভবিষ্যতের বড় প্রকল্পের ভিত্তি তৈরি। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাতে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়।

পরে ২০১৪ সালে প্যানএশিয়া পাওয়ার সার্ভিস লিমিটেডের মাধ্যমে তা পুনরায় মেরামত করে চালু করা হয়। তবে প্রায় ছয় বছর চালু থাকার পর ২০২১ সালের প্রথমদিকে আবারও তা বন্ধ হয়ে পড়ে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, প্রকল্পটি থেকে জাতীয় গ্রিডে মোট ৮ লাখ ৮৮ হাজার কিলোওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছিল।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে সাতটি পদে জনবল নিয়োগের নির্দেশনা দেওয়া হলেও বাস্তবে কেউ যোগ দেননি। ফলে কেন্দ্রটি পুনরায় চালু হয়নি। বর্তমানে এ কেন্দ্রের চারটি টারবাইনের পাখা একেবারে বন্ধ, যন্ত্রাংশ মরিচা পড়া অবস্থায় আছে এবং বিদ্যুৎ সরঞ্জামের চুরি এখন নিয়মিত ঘটনা।

২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রাংশ চুরির সময় তিনজন আন্তঃজেলা ট্রান্সফরমার চোরকে হাতেনাতে ধরে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। প্রকল্পটি বর্তমানে কোনো ঘেরাও বা নিরাপত্তা প্রাচীর ছাড়াই পড়ে আছে। এই সুযোগে ভূমিদস্যু চক্র ভুয়া স্ট্যাম্প ও ইজারা দলিল দেখিয়ে জায়গা দখলের চেষ্টা করছে।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও দেখভালের দায়িত্বে থাকা গাজী কেফায়েত জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর থেকে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ভুয়া স্ট্যাম্প ও কাগজপত্র দেখিয়ে জমি দখলের চেষ্টা করছেন। তারা যেসব ইজারা দলিল দেখান, তাতে মৌজার নাম, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর এমনকি জমির পরিমাণ পর্যন্ত উল্লেখ নেই।

মুহুরী প্রকল্প এলাকার মৎস্য চাষি শাহীন মিয়া বলেন, এত বড় প্রকল্প এভাবে পড়ে থাকবে—এটা মেনে নেওয়া যায় না। সরকারের কাছে অনুরোধ, এটা যেন আবার চালু করা হয়। বিদ্যুৎ দরকার আমাদের, খালি লোক দেখানো প্রকল্প দরকার নাই।

স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম বোরহান উদ্দিন জানান, সরকার বলছে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ দরকার, আর সেই প্রকল্পই এখন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। প্রশাসন বা পিডিবি কারোই কোনো মাথাব্যথা নেই।

স্থানীয় ঠিকাদার রফিকুল ইসলাম জানান, আমরা কয়েকবার কথা বলেছি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) লোকজনের সঙ্গে। তারা বলছে, জনবল ও বরাদ্দ নেই। অথচ কোটি টাকার জিনিস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সরকার একটু নজর দিলে এটি আবার সচল করা সম্ভব।

ইকবাল হোসেন নামের একজন প্রকৌশলী জানান, আমার জানা মতে এই প্রকল্পে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা এখনো আছে। কিন্তু উচ্চপর্যায়ের কেউ উদ্যোগ নিচ্ছে না। মূল সমস্যা হলো রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রকৌশল জনবল না থাকা।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বিদ্যুৎ ঘাটতির এই সময়ে প্রকল্পটি সচল থাকলে এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে পারত। অথচ পিডিরি প্রকল্পটি নিয়ে সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে।

সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রিগ্যান চাকমা বলেন, ‘আমি এই উপজেলায় কয়েকদিন হলো যোগদান করেছি। বিষয়টি আমার জানা নাই। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব।’

এ প্রকল্পের বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ফেনী-এর নির্বাহী প্রকৌশলীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভিওডি বাংলা/জহির আদনান/আ

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
নতুন পানি চুক্তি করতে যাচ্ছে ঢাকা-দিল্লি
নতুন পানি চুক্তি করতে যাচ্ছে ঢাকা-দিল্লি
চাহিদা বেশি ডিজেলের, কিন্তু অকটেন পেট্রোলে কেন টান পড়ছে?
চাহিদা বেশি ডিজেলের, কিন্তু অকটেন পেট্রোলে কেন টান পড়ছে?
কী পরিমান বিদ্যুৎ বাঁচবে সরকারের বিধি নিষেধে?
কী পরিমান বিদ্যুৎ বাঁচবে সরকারের বিধি নিষেধে?