ট্রাম্পের নীরবতা, বিশ্বজুড়ে বাড়ছে উৎকন্ঠা

পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার ঐতিহাসিক আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোতে রাজি হয়নি ইরান। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল হরমুজ প্রণালি।
এই শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর অনেকটাই নীরব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই নীরবতা সবাইকে ভাবিয়ে তুলছে। এ অবস্থায় সামনে কী হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদিও দুই দেশের দীর্ঘ আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ছয় বার ফোন করেছিলেন। আলোচনার নানা ইস্যুতে তারা কথাবার্তা বলেন।
ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলে দু’পক্ষ যখন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তিনি বলেন, তারা যুদ্ধে হেরে গেছে। হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণ করে তাতে জাহাজ চলাচলের জন প্রস্তুত করছেন বলেও জানান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বেশ কয়েকটি জাহাজ ওই প্রণালি দিয়ে অতিক্রম করেছে বলেও কিছু গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। তবে ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে।
শনিবার (১১ এপ্রিল) দীর্ঘ ৪৭ বছর পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ নেতারা মুখোমুখি বসলেও আলোর মুখ দেখেনি শান্তি আলোচনা। প্রথম দফার বৈঠকে তারা নিজেদের মধ্যে নথি বিনিময় করেন। এরপরই টেকনিক্যাল লেভেলে আলোচনা শুরু হয়।
রোববার (১২ এপ্রিল) সকালে ঐতিহাসিক এই আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে বলে জানান, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স।
এদিন সকালে ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে হতাশার সুরে জে ডি ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো স্পষ্টভাবে ইরানকে জানিয়েছে। তবে ইরান তাতে রাজি হয়নি। সমঝোতা ছাড়াই পাকিস্তান ছাড়ার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এটি দুঃসংবাদ।
আলোচনায় দুই পক্ষের কৌশলেও ছিল বড় পার্থক্য। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সমাধান চাইলেও ইরান দীর্ঘমেয়াদি ধীরগতির আলোচনায় অভ্যস্ত। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, তারা তাদের ‘চূড়ান্ত প্রস্তাব’ দিয়েছে। এখন সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব অনেকটাই ইরানের ওপর।
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত’ এবং ‘অযৌক্তিক’ দাবির কারণেই আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে ইউরেনিয়াম শোধন ইস্যুটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান বহুদিন ধরে বলছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না, বরং শুধু জ্বালানি কর্মসূচি চালাতে চায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরেনিয়াম শোধনের মাত্রা বাড়ানোয় পশ্চিমা দেশগুলো উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে, যা গত বছরের ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতের অন্যতম কারণ ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স বলেন, ইরান যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, সে বিষয়ে তাদের কাছ থেকে একটি ‘স্পষ্ট অঙ্গীকার’ প্রয়োজন। সহজ কথা হলো, আমাদের এমন একটি জোরাল প্রতিশ্রুতি দেখতে হবে যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। এমনকি দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে সক্ষম—এমন কোনো সরঞ্জাম বা প্রযুক্তিও তারা অর্জনের চেষ্টা করবে না।
ইরানের প্রতিনিধি দলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় এমন কিছু বিষয় দাবি করেছে, যা তারা যুদ্ধের মাধ্যমেও অর্জন করতে পারেনি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাগাই। তিনি বলেছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র বেশ কিছু বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছালেও গুরুত্বপূর্ণ দুই-তিনটি বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে।
ইসমাইল বাগাই বলেন, ‘এ আলোচনা হয়েছে ৪০ দিনের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের পর, যেখানে চারদিকে শুধু অবিশ্বাস আর সন্দেহ। স্বাভাবিকভাবেই প্রথম বৈঠকেই কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা আমাদের ছিল না। আর তেমনটা কেউ আশাও করেনি।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে ইরান সরকার জানিয়েছে, ইসলামাবাদে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে দুই দেশের কারিগরি দল এখন বিস্তারিত প্রস্তাব ও ‘বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের খসড়া’ বিনিময় করছে।
পোস্টে আরও বলা হয়, কিছু বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনা অব্যাহত থাকবে। এর মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর দূরত্ব কমিয়ে আনতে আলোচনা এখন খসড়া তৈরির চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
ইসলামাবাদে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, আজ (রোববার) সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যকার বৈঠক শেষ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুই দেশ আগামীতেও ‘ইতিবাচক মনোভাব’ বজায় রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ইসহাক দার বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টা ধরে দুপক্ষের মধ্যে চলা কয়েক দফার নিবিড় ও গঠনমূলক আলোচনায় আমি নিজে এবং চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির মধ্যস্থতা করেছি।’
ইসহাক দার আরও বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার প্রশংসা করায় আমি উভয় পক্ষকে ধন্যবাদ জানাই।’
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আশা প্রকাশ করে বলেন, পুরো অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে উভয় পক্ষ এ ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখবে।
পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শেষ হলেও এখনো পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তার এই নীরবতাকে অনেকেই ‘অস্বাভাবিকভাবে উদ্বেগজনক’ হিসেবে দেখছেন।
ইসলামাবাদের সংলাপ শেষ হলেও এখন বড় প্রশ্ন হলো- কূটনীতি কি এখানেই শেষ, নাকি আবার নতুন করে আলোচনা শুরু হবে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অবস্থানের ওপর।
ট্রাম্প কী বলবেন, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ কয়েক দিন আগেই তিনি সামাজিক মাধ্যমে কঠোর হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, একটি সম্পূর্ণ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। সেই প্রেক্ষাপটে তার বর্তমান নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
বর্তমানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, যার মেয়াদ এখনও প্রায় ১০ দিন বাকি। পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ দেশই চাইছে এই যুদ্ধবিরতি পুরো সময় পর্যন্ত বজায় থাকুক।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদের বৈঠক কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং ।
তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত হতাশাজনক যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদ আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে।’
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং আবারও আলোচনায় ফেরা।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/এসআর







