পীর হত্যায় শনাক্ত ১৫: নির্বিঘ্নে হামলা চালাতে পুলিশকে ব্যস্ত রাখেন ‘জামায়াত’ নেতা

কুষ্টিয়ায় পীরকে হত্যা ও তার দরবারে (আস্তানা) আগুন দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ, যিনি হামলার প্রস্তুতির বিষয়টি পুলিশের কাছে চেপে গিয়েছিলেন।
তিনি স্থানীয় জামায়াতের শীর্ষ সারির নেতা—যাকে মূল হোতা ধরে তদন্তের একপর্যায়ে বেরিয়ে এসেছে আরও কয়েকটি নাম—যারা হামলার পেছনে ভূমিকা রাখেন।
এছাড়া আরও ১৫–২০ জন শনাক্ত হয়েছে, যাদের সিসিটিভির ফুটেজে সক্রিয় দেখা গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তকারী পুলিশের একটি সূত্র বলছে, সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজন নেতাকে নজরদারিতে রাখা হচ্ছে এবং যেকোনো সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
এ হামলার নির্দেশ কেন্দ্র থেকে স্থানীয় ওই নেতার কাছে এসেছে কি না, তা নিশ্চিত হতে তথ্য-উপাত্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া মোটিভ মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি কোনো দলের কেন্দ্রও জড়িত থাকে, তাহলেও ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, জামায়াতের স্থানীয় এক শীর্ষ নেতাকে ইতোমধ্যে হেফাজতে নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরেকটি ইউনিট। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য নেওয়া হচ্ছে। তদন্তকারীদের কাছে এখন পর্যন্ত এটিকে পরিকল্পিত হত্যা ও হামলা মনে হচ্ছে।
ফিলিপনগর এলাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ৭টি আইডি (তিনটি পেজ ও চারটি ব্যক্তিগত আইডি) থেকে ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট হতে থাকে শুক্রবার (১০ এপ্রিল) দিনগত রাত থেকে।
ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা ভিডিওর লিংকগুলো পরদিন শনিবার (১১ এপ্রিল) সকাল পর্যন্ত ফিলিপনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের মানুষের মেসেঞ্জার ও আইডিতে শেয়ার হতে থাকে।
সকাল ৯টার দিকে এই লিংকগুলোর তথ্য জেলার স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের নজরে আসে। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা ফিলিপনগর এলাকায় কিছু ঘটতে যাচ্ছে কি না, ভিডিওগুলো সম্পর্কে জানতে চেয়ে স্থানীয় কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপ করছিলেন। এমন সময়েই শুরু হয় হামলা।
আজ রোববার (১২ এপ্রিল) দুপুরে ঘটনাস্থল-সংলগ্ন একটি চায়ের দোকানে বসে থাকা কয়েকজন তরুণ ও যুবক বলেন, যে ফেসবুকগুলো থেকে ধর্মীয় অবমাননা বিষয়ক ভিডিও বলে ৩২ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপটি ছড়ানো হয়েছে, ওই ফেসবুক আইডিগুলোর নাম বাংলায় লেখা। ‘সত্যের সন্ধানে ফিলিপনগর’ পেইজ থেকে সবচেয়ে বেশি প্রপাগান্ডা ছড়ানো হয়।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, দরবারে তাদের কোনো বিষয় আছে কি না। তিনি জানিয়েছিলেন, তেমন কোনো বিষয় নেই। তবে আসরের নামাজের পর ইউনিয়নের বেশ কিছু মুসল্লি নিয়ে বৈঠক আছে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘তার সঙ্গে সকাল থেকেই কথা চলছিল। কিন্তু একপর্যায়ে বুঝতে পারি, ওই নেতার কথা সন্দেহজনক। তাকে জোর করে বলা হয়—আপনাদের কোনো বৈঠকে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে কি না। জানতে চাইলে ওই নেতা পুলিশকে বারবার জানিয়েছেন, আসরের পর বৈঠকের কথা। কিন্তু সেটা দরবারে (হামলা চালানো মাজার) না।’
ইতিমধ্যে পুলিশের একাধিক টিম ফিলিপনগর গ্রামে টহল দিতে থাকে। দুই থেকে তিনজন পুলিশ সদস্য বেলা ১১টার দিকে হামলার শিকার দরবারেও উপস্থিত হয়। বেলা ২টা ৩৬ মিনিটের দিকে হঠাৎ করে গ্রামের পাকা সড়ক দিয়ে শতাধিক মানুষ দেশীয় লাঠিসোঁটা নিয়ে দরবারে গিয়ে হামলা চালাতে থাকে। তাদের মধ্যে কয়েকজন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীকে দেখা গেছে।
স্থানীয় পুলিশের আরেকটি সূত্র বলছে, যে সাতটি ফেসবুক আইডি থেকে ভিডিওগুলো ছড়ানো হয়, সেগুলোর দুই–একটির অ্যাডমিনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে। এ ছাড়া হামলা–ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত ১৫ থেকে ১৮ জনকেও শনাক্ত করা গেছে।
আজ রোববার (১২ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, ধর্ম অবমাননা করা অন্যায়, তেমনি কোনো মানুষকে হত্যা করা, বাড়ি ভাঙচুর করা, হামলা চালানোও অন্যায়। আইনের ভিত্তিতে এর সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার করা হবে। পুলিশের একাধিক দল সব বিষয় নিয়ে কাজ করছে।
এদিকে সকাল থেকে নিহত পীরের ভক্ত–অনুসারীরা ছুটে আসছেন দরবার শরিফে। তারা ভাঙচুর করা ঘরবাড়ি ও আসবাবপত্র দেখছেন। নিহত পীরের দরবারে বর্তমানে অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে। বিজিবির একটি দলও পরিদর্শন করে গেছে ঘটনাস্থল।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/এমএস







