• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

নারায়ণগঞ্জের সাত খুন: ১২ বছরেও শেষ হয়নি বিচার

নিজস্ব প্রতিবেদক    ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০১:১২ পি.এম.
ছবি: সংগৃহীত

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল। দুপুরের ব্যস্ত সময়। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে চলছিল স্বাভাবিক যান চলাচল। ঠিক তখনই সাদা পোশাকে একটি দল তল্লাশি চৌকি বসিয়ে একটি প্রাইভেট কার থামায়। গাড়িতে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগীরা। কয়েক মিনিটের মধ্যে তাঁদের তুলে নেওয়া হয়। প্রায় একই সময়ে একই সড়ক থেকে তুলে নেওয়া হয় সিনিয়র আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর গাড়িচালককে।

এরপর তিন দিন নিখোঁজ থাকেন তাঁরা। উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক আর অপেক্ষার প্রহর। ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে ওঠে একে একে ছয়জনের মরদেহ, পরদিন উদ্ধার হয় আরেকজনের দেহ। সাতজন মানুষের নির্মম হত্যাকাণ্ডে দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং প্রশ্ন ওঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। ঘটনার ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার এখনো শেষ হয়নি।

নিহতরা হলেন— প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তাঁর বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, সহযোগী তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহীম।

বাবাহীন শৈশব: রোজার গল্প

এই হত্যাকাণ্ডের নীরব কিন্তু গভীর প্রতিধ্বনি শোনা যায় রোজা আক্তার জান্নাতের জীবনে। এখন তার বয়স ১২। তার বাবা জাহাঙ্গীর আলম এই ঘটনার একজন শিকার। বাবার মৃত্যুর এক মাস পর জন্ম রোজার। ফলে বাবাকে কখনো দেখেনি সে—তার কাছে বাবা মানে একটি ফ্রেমবন্দী ছবি আর মায়ের চোখের জল।

রোজার মা শামসুন্নাহার আক্তার নুপুর বলেন, মাদরাসায় অন্য শিশুরা যখন বাবার হাত ধরে আসে, তখন তার মেয়ে চুপ হয়ে যায়। বাসায় ফিরে কাঁদতে কাঁদতে জানতে চায়—‘আমার বাবা কোথায়?’

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে চুক্তিভিত্তিক চাকরি করে কোনোভাবে সংসার চালান নুপুর। শ্বশুরবাড়ির একটি ঘরে মা-মেয়ে থাকেন। কষ্টের মধ্যেও মেয়েকে পড়াশোনা করাচ্ছেন তিনি।

ক্ষোভভরা কণ্ঠে নুপুর বলেন, “১২ বছর হয়ে গেল, এখনো আমার স্বামীর হত্যার বিচার দেখলাম না। আর কতদিন অপেক্ষা করব?”

পরিবারগুলোর বেদনা

নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা আক্তার বিউটি বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। “প্রতিদিন মনে হতো বাঁচার কোনো অর্থ নেই। তবে সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে সামলাই,” বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, “পাঁচ-ছয় বছর পর বুঝলাম, আমাকে বাঁচতে হবে সন্তানদের জন্য।”

বিউটি জানান, সেই সময় বেগম খালেদা জিয়া তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। এখনো সেই প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে আছেন তারা।

নিহত তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়ের বলেন, “এই বয়সে এসে একটাই ইচ্ছা—বিচার দেখে যেতে চাই। পারব কি না জানি না।”

তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া

মামলার নথি অনুযায়ী, ওই দিন আদালত থেকে জামিন নিয়ে ফিরছিলেন নজরুল ইসলাম। লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকায় সাদা পোশাকধারীরা তাঁর গাড়ি থামিয়ে তাঁকে ও তাঁর সহযোগীদের তুলে নেয়। তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার হয়।

পোস্টমর্টেম ও তদন্তে নির্মম নির্যাতনের প্রমাণ মেলে। এ ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে র‍্যাবের কিছু সদস্যের সম্পৃক্ততার অভিযোগ জনমনে ক্ষোভ তৈরি করে।

তদন্তে জানা যায়, নজরুল ইসলামের সঙ্গে সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেনের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব ছিল। আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক প্রভাবের সংঘাত একপর্যায়ে এই হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়।

২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন নূর হোসেন এবং র‍্যাব-১১-এর সাবেক তিন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ হোসেন ও কমান্ডার এম এম রানা।

২০১৮ সালের আগস্টে হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং অন্যদের সাজা কমিয়ে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ‘লিভ টু আপিল’ পর্যায়ে রয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবুল কালাম আজাদ জাকির বলেন, “প্রক্রিয়াগতভাবে মামলা এগিয়েছে, তবে লিভ টু আপিল পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। আমরা দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করছি।”

ভিওডি বাংলা/আ

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
দেশের সব বিমানবন্দরে ‘উচ্চমাত্রার সতর্কতা’ জারি
দেশের সব বিমানবন্দরে ‘উচ্চমাত্রার সতর্কতা’ জারি
সমষ্টিগত উন্নয়নই আমাদের মূল লক্ষ্য : হাবিবুর রশিদ হাবিব
সমষ্টিগত উন্নয়নই আমাদের মূল লক্ষ্য : হাবিবুর রশিদ হাবিব
বাজেটে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য বরাদ্দ রাখা হবে : অর্থমন্ত্রী
বাজেটে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য বরাদ্দ রাখা হবে : অর্থমন্ত্রী