দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য:
দেশে নতুন করে আরেকটি শিক্ষা আন্দোলনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে

বাংলাদেশে শিক্ষাখাতকে ঘিরে নতুন ধরনের আন্দোলনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার মতে, এখন আর শুধু শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোই বড় চ্যালেঞ্জ নয়; বরং শিক্ষার প্রকৃত মান, দক্ষতা ও ফলাফল নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত জাতীয় অগ্রাধিকার।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাজধানীতে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘সরকারের অগ্রাধিকার ও শিক্ষা খাত: বাজেট ও বাস্তবতা’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে এগোতে হলে মানসম্পন্ন শিক্ষার বিকল্প নেই। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ, ব্যয়ের সঠিক ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, অনেক সময় দাবি করা হয় যে সরকার শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত অগ্রাধিকার নির্ধারণ হয় বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে। পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছাড়া শিক্ষাখাতে উন্নয়নের দাবি বাস্তবসম্মত নয়। একই সঙ্গে বরাদ্দের অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষায়, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই শিক্ষার মান উন্নত হয় না। শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশে এখনও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে মেয়েদের ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ এবং শিশুশ্রমের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে শিক্ষার অগ্রগতি টেকসই হবে না।
তিনি উল্লেখ করেন, দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি কার্যক্রম সহায়ক হলেও সেটি একমাত্র সমাধান নয়। কারণ শিক্ষা গ্রহণের সঙ্গে পরিবারগুলোর আরও নানা ধরনের ব্যয়ে জড়িত থাকে, যা অনেক সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বলেও জানান তিনি। মানুষের প্রত্যাশা, শিক্ষাব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা দূর করে একটি কার্যকর ও মানসম্পন্ন শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা হোক।
সংলাপে ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার নিয়েও সতর্ক করেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিক্স ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তনের কারণে আগামী দিনে বহু প্রচলিত চাকরি হারিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
তবে দেশের তরুণ সমাজ সেই পরিবর্তিত শ্রমবাজারের জন্য কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ তৈরিতে এখনও পিছিয়ে রয়েছে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, একসময় মূল লক্ষ্য ছিল সবাইকে শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা। কিন্তু এখন সময় এসেছে শিক্ষার ফলাফল নিশ্চিত করার আন্দোলন গড়ে তোলার। তিনি বলেন, “আগে ছিল শিক্ষার জন্য আন্দোলন, এখন প্রয়োজন শিক্ষার ফলাফলের জন্য আন্দোলন।”
তিনি আরও বলেন, শিক্ষা সংস্কারকে কেবল নীতিগত আলোচনা বা কারিগরি মতামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। এটিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। এ লক্ষ্যে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়েও একটি জোট গঠনের চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানান তিনি।
ভিওডি বাংলা/জা







