মসলার বাজার এবার নাগালে

আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবাধে প্রবেশ করছে নানা ধরনের মসলা। যার ফলে মসলার বাজারে অনেকটা স্বস্তি বিরাজ করছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে স্বস্তি ফিরলেও অবৈধ পথে পণ্য প্রবেশ অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে বৈধ আমদানিকারকরা বড় ধরনের সংকটে পড়বেন। একই সঙ্গে সরকারও হারাবে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মসলার পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ ঘুরে দেখা গেছে, গত এক মাসে জিরা, এলাচ, লবঙ্গ, দারুচিনি ও গোলমরিচসহ বিভিন্ন ধরনের গরম মসলার দাম কিছুটা কমেছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, কোরবানির ঈদ উপলক্ষে চাহিদা বাড়লেও সীমান্ত পথে অতিরিক্ত মসলা প্রবেশ করায় বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেছে। ফলে পাইকারি বাজারে দামে প্রভাব পড়েছে।
খাতুনগঞ্জের ইলিয়াছ মার্কেট ও জাফর মার্কেটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ মসলার পাইকারি বাজার। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দেশে ব্যবহৃত গরম মসলার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। চিকন জিরা, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ ও গোলমরিচের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে কোরবানির সময়।
আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, ভারত সীমান্তঘেঁষা সিলেট, কুমিল্লা ও ফেনী অঞ্চল দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মসলা অবৈধভাবে দেশে ঢুকছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে জিরা, এলাচ, কিশমিশ, কাজুবাদাম ও বিভিন্ন ধরনের গরম মসলা। ডিউটি ছাড়াই আসায় এসব পণ্য তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী ও আমদানিকারক আবদুর রাজ্জাক বলেন, “বৈধভাবে আমদানি করা জিরায় কেজিপ্রতি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত শুল্ক দিতে হয়। এলাচে শুল্ক পড়ে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। কিন্তু চোরাই পথে আসা পণ্যে এসব খরচ নেই। ফলে বাজারে বৈধ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে হিমশিম খাচ্ছেন।”
তিনি জানান, বাংলাদেশে এলাচ সবচেয়ে বেশি আসে গুয়াতেমালা থেকে। এছাড়া ভারত থেকেও কিছু এলাচ আসে স্থলবন্দর দিয়ে। দারুচিনি মূলত চীন ও ভিয়েতনাম থেকে আমদানি হয়। গোলমরিচ আসে ভিয়েতনাম থেকে এবং চিকন জিরার বড় অংশ ভারতনির্ভর।
খাতুনগঞ্জের গরম মসলা ব্যবসায়ী মো. বাদশা বলেন, “ডিউটি দিয়ে আমদানি করা জিরার কস্টিং পড়ছে কেজিতে প্রায় ৫৩০ টাকা। অথচ চোরাই পথে আসা জিরা ৫০০ টাকাতেই বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে এলাচ আমদানি করে বাজারে আনতে কেজিতে ৪১০০ থেকে ৪২০০ টাকা খরচ হচ্ছে, কিন্তু অবৈধ পথে আসা এলাচ ৪ হাজার টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে।”
তার দাবি, গত এক মাসে বেশিরভাগ মসলার দাম কমেছে। আগে যে জিরা ৫৫০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা ৫২০ থেকে ৫৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এলএমজি এলাচ ৩৯০০ টাকা থেকে কমে ৩৭০০ টাকায় নেমেছে। লবঙ্গ ১৩০০ টাকা থেকে কমে হয়েছে ১২৬০ টাকা। একইভাবে দারুচিনির দাম কেজিতে প্রায় ২০ টাকা কমেছে।
খাতুনগঞ্জের ইলিয়াছ-বশর মার্কেট মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাজল পালিত বলেন, “ঈদ উপলক্ষে প্রচুর মসলা আমদানি করা হয়েছে। কিন্তু বাজার এখন চোরাই পথে আসা পণ্যে সয়লাব। এতে বৈধ আমদানিকারকরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। অবৈধ সিন্ডিকেটের কারণে স্বাভাবিক ব্যবসা হুমকির মুখে।”
মসলা ব্যবসায়ী মো. সেকান্দার বলেন, “সীমান্ত দিয়ে সব সময়ই কিছু মসলা আসে। তবে এবার পরিমাণ বেশি। ভারতের বাজারে কিছু পণ্যের দাম কম থাকায় সেগুলো বাংলাদেশে পাচার হচ্ছে। ডিউটি না থাকায় কম দামে বিক্রি করেও লাভ করতে পারছে চোরাকারবারিরা।”
অন্যদিকে, ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, শুধু চোরাই পণ্য নয়, বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকাও দামের পতনের অন্যতম কারণ।
ক্যাবের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, “বাংলাদেশের বাজারদর প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বেশি হলেই সীমান্ত দিয়ে মসলাজাতীয় পণ্য ঢুকে পড়ে। তবে এবার খাতুনগঞ্জসহ পাইকারি বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমেছে। যদিও রাজস্ব ফাঁকি ও অবৈধ বাণিজ্য বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।”
রাষ্ট্রীয় সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যেও মিলেছে দামের নিম্নমুখী প্রবণতা। সংস্থাটির তথ্যমতে, বর্তমানে পাইকারিতে জিরা বিক্রি হচ্ছে ৫৬০ থেকে ৬৮০ টাকা কেজিতে, যা এক মাস আগে ছিল ৫৭০ থেকে ৫৮০ টাকা। দারুচিনি বিক্রি হচ্ছে ৩৭০ থেকে ৪০০ টাকায়। লবঙ্গের দাম ১২০০ থেকে ১৩২০ টাকা এবং গোলমরিচ বিক্রি হচ্ছে ১০২০ থেকে ১০৬০ টাকার মধ্যে।
ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/এমএস







