রোহিঙ্গাদের জন্য ৯ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে জাতিসংঘ

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীরা না পাচ্ছে নিজ রাষ্ট্র, না পাচ্ছে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম প্রাপ্তিটুকু। দিনদিন আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে মানবিক সহায়তা কমতে থাকায় নানান অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরেছে তাদের। বাস্তুচ্যুতির এক দশক পরেও জীবন পুনর্গঠনের সুযোগ খুঁজতে হচ্ছে রোহিঙ্গাদের।
এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় গত ২০ মে যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার (জেআরপি) ২০২৬ সালের হালনাগাদ সংস্করণ প্রকাশ করে নতুনভাবে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাকে (ইউএনএইচসিআর)।
বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরনার্থীদের এক বছর সহায়তার জন্য চাওয়া হয়েছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এর ৬০ শতাংশ অর্থায়ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে বলে জাতিসংঘের বাংলাদেশ কার্যালয়।
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, নতুন এই অর্থায়নের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধিসহ এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহায়তা দেয়া সম্ভব হবে, যেখানে এতদিন অর্থের ঘাটতি ছিল।
মিয়ানমারে লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতা ও নিপীড়নের মুখে পালিয়ে আসার প্রায় এক দশক পরেও বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
অন্যদিকে, রোহিঙ্গাদের জন্য ২০ লাখ ইউরো বা প্রায় ২৯ কোটি টাকা (১ ইউরো = ১৪৪.৫ টাকা দর) বরাদ্দ করেছে ফিনল্যান্ড সরকার। জীবন রক্ষাকারী সহায়তা ও সুরক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে ইউএনএইচসিআরকে এ অনুদান দিচ্ছে দেশটি।
বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন বলেন, এই অনুদান এমন সময়ে এলো, যখন জাতিসংঘ ও এর মানবিক অংশীদারেরা রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় নতুন করে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ফিনল্যান্ডের বর্ধিত প্রতিশ্রুতি তাদের অসাধারণ উদারতার পরিচয় বহন করে।’
জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বব্যাপী জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সুরক্ষায় ফিনল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে মানবিক সহায়তা ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। ২০২৬ সালে দেশটি ইউএনএইচসিআরের মূল তহবিলে আরো ৭০ লাখ ইউরো দিচ্ছে, যা সংস্থাটি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারবে।
ইউএনএইচসিআরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে মাত্র ২৩ শতাংশ শরণার্থী পরিবার ‘কাজের বিনিময়ে অর্থ’ কর্মসূচির মাধ্যমে আয় করেছে, যা তাদের জন্য অনুমোদিত একমাত্র আনুষ্ঠানিক জীবিকামূলক কার্যক্রম। ৪২ শতাংশ পরিবারের আয়ের উৎস ছিল অস্থায়ী এবং অনিশ্চিত, আর ৩৫ শতাংশ পরিবারের আয়ের কোনো উৎসই ছিল না।
তহবিল সংকোচনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারী, কিশোরী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বয়স্ক মানুষ। পাশাপাশি ২০২৪ সালের শুরু থেকে বাংলাদেশে আসা প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গাও এই ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। ক্যাম্পগুলোতে জায়গার অভাবে তাদের অনেকেই এখনো আশ্রয়হীন অবস্থায় রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক সহায়তার পাশাপাশি একটি উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে দক্ষতা ও স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করতে হবে। একইসাথে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং তাদের দুর্দশা যেন বৈশ্বিক দৃষ্টি থেকে হারিয়ে না যায়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।’
জাতিসংঘ বাংলাদেশ অফিস জানিয়েছে, জেআরপি পরিকল্পনার আওতায় শরণার্থী ও স্থানীয় বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীসহ ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছাতে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ৮ হাজার ৭৩১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা (১ ইউএস ডলারের মূল্য ১২২.৯ টাকা হারে) চাওয়া হয়েছে। যা ২০২৫ সালের জেআরপির তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। এটি মূলত জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম অর্থায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
ইউএনএইচসিআর জানায়, বছরের মাঝামাঝি সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় এই আবেদনের ইতোমধ্যে ৬০ শতাংশ অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে।
ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলার প্রচেষ্টা এখন একটি নাজুক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ক্রমহ্রাসমান তহবিল, ক্যাম্পের অবনতিশীল পরিস্থিতি, ক্রমবর্ধমান সুরক্ষা ঝুঁকি এবং মিয়ানমারের চলমান অস্থিতিশীলতা এর প্রমাণ।’
তার ভাষ্য, ‘মিয়ানমারের পরিস্থিতি স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের অনুকূল না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়তা করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।’
ইউএনএইচসিআরের মতে, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করতে এবং মিয়ানমারে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার সাথে জীবনযাপন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ও অর্থায়ন অব্যাহত রাখা জরুরি।
ভিওডি বাংলা/আরআর/বিন্দু







