শিক্ষকের বিদায়ে আবেগঘন আয়োজন, টিটিসিতে বিরল দৃষ্টান্ত

ঢাকা সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের (টিটিসি) ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. রঞ্জিত পোদ্দারের বিদায় অনুষ্ঠান যেন রূপ নেয় এক অনন্য আবেগঘন মিলনমেলায়। বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমী আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সংবর্ধনা কলেজটির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেলে কলেজ অডিটোরিয়ামে শুরু হওয়া এ অনুষ্ঠান রাত ১০টা পর্যন্ত চলে। দীর্ঘ সময়জুড়ে চলা আয়োজনে অংশ নেন বিভিন্ন ব্যাচের শতাধিক সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, সহকর্মী শিক্ষক এবং শুভানুধ্যায়ীরা। অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল আবেগ, স্মৃতিচারণ, সম্মাননা ও ভালোবাসার প্রকাশ।
বিদায় অনুষ্ঠানকে ঘিরে প্রায় এক মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। অডিটোরিয়াম সাজানো থেকে শুরু করে অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, ডকুমেন্টারি নির্মাণ, অতিথি সমন্বয়-সবকিছুতেই ছিল শিক্ষার্থীদের সরব অংশগ্রহণ। পুরো মিলনায়তনকে সাজানো হয় বর্ণিল ব্যানার, আলোকসজ্জা ও ফুল দিয়ে।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই অধ্যাপক ড. রঞ্জিত পোদ্দার অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করলে শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেন। হাতে ফুল নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা করতালি ও ফুল ছিটিয়ে প্রিয় শিক্ষককে অভ্যর্থনা জানান। এ সময় পুরো মিলনায়তনে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মূল পর্বে একে একে বক্তব্য দেন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা। তারা তুলে ধরেন শ্রেণিকক্ষের ভেতরে ও বাইরে ড. রঞ্জিত পোদ্দারের অসামান্য অবদান, শিক্ষার্থীবান্ধব আচরণ এবং অনন্য পাঠদানের অভিজ্ঞতা। অনেকেই বলেন, তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না; বরং ছিলেন অভিভাবক, পরামর্শদাতা ও অনুপ্রেরণার উৎস।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্যে উঠে আসে, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যকে সহজ ও প্রাণবন্ত করে তুলতে তার বিশেষ দক্ষতা ছিল। কঠিন বিষয়ও তিনি উদাহরণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করতেন, যা শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ বাড়িয়ে দিত। ক্লাসরুমে তার আন্তরিকতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি ব্যক্তিগত মনোযোগ তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ বক্তব্য দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। তাদের আবেগে কিছু সময়ের জন্য পুরো অডিটোরিয়াম নীরব হয়ে যায়। উপস্থিত অনেক শিক্ষক ও অতিথিকেও চোখ মুছতে দেখা যায়।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নন, ড. রঞ্জিত পোদ্দারের সহকর্মীরাও তার কর্মজীবনের নানা দিক তুলে ধরেন। তারা বলেন, শিক্ষকতা পেশায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ একজন মানুষ। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
সহকর্মীদের অনেকে মন্তব্য করেন, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে এর আগে বহু শিক্ষক অবসরে গেছেন, তবে এত বড় পরিসরে ও এত আবেগঘন পরিবেশে কাউকে বিদায় জানানোর নজির খুব কম রয়েছে। বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত এ আয়োজন টিটিসির ইতিহাসে বিরল উদাহরণ হয়ে থাকবে বলেও তারা উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল প্রায় ৪০ মিনিটের একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন। সেখানে ড. রঞ্জিত পোদ্দারের শিক্ষকতা জীবন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক, গবেষণা কার্যক্রম এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। ভিডিওটিতে তার সাবেক শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা ও শুভেচ্ছাবার্তাও স্থান পায়।
ডকুমেন্টারিতে উঠে আসে, কীভাবে তিনি শিক্ষার্থীদের লেখালেখি, গবেষণা এবং উচ্চশিক্ষার প্রতি উৎসাহিত করতেন। তার অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বক্তব্য দেন অধ্যাপক ড. রঞ্জিত পোদ্দার। মঞ্চে উঠেই তিনি শিক্ষার্থীদের এমন ভালোবাসা ও সম্মানে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কিছু সময় নীরব থাকার পর নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।

তিনি বলেন, একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় অর্জন তার শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা। অবসর জীবনে গেলেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক অটুট থাকবে। ভবিষ্যতেও শিক্ষা, গবেষণা ও পরামর্শমূলক কাজে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি।
ড. রঞ্জিত পোদ্দার একাধারে শিক্ষক, শিক্ষক প্রশিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে পরিচিত। নরসিংদীর ভাগদী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি রাবান উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৮৩ সালে এসএসসি পাস করার পর ভর্তি হন ঢাকার নটরডেম কলেজে। সেখান থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সে ভর্তি হন।
১৯৮৮ সালে স্নাতক এবং ১৯৮৯ সালে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর) থেকে ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন সম্পন্ন করেন। ১৭তম বিসিএসের মাধ্যমে ১৯৯৮ সালে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।
২০১৪ সালে তিনি সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ঢাকায় ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ এক যুগ সেখানে শিক্ষকতা শেষে সম্প্রতি অবসরে যান।
কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে নিউজিল্যান্ডের ক্যান্টারবেরি ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার অব এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন সম্পন্ন করেন। পরে যুক্তরাজ্যের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও আরেকটি মাস্টার অব এডুকেশন ডিগ্রি লাভ করেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংলিশ এডুকেশনের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

ড. রঞ্জিত পোদ্দারের শতাধিক উপসম্পাদকীয় ও ৩০টির বেশি গবেষণা প্রবন্ধ বিভিন্ন জার্নাল ও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ইংরেজি পাঠ্যবই প্রণয়নেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও লেখালেখিতে উৎসাহ দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যারা গবেষণা বা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী, তাদের নিয়মিত দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা দিয়েছেন তিনি। শিক্ষার্থীদের অনেকেই তার পরামর্শে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় যুক্ত হয়েছেন।

শিক্ষকতা, গবেষণা এবং শিক্ষা উন্নয়নে দীর্ঘদিনের অবদানের জন্য ড. রঞ্জিত পোদ্দারকে একজন প্রভাবশালী শিক্ষাবিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার বিদায় অনুষ্ঠান তাই শুধু আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; বরং ছিল একজন প্রিয় শিক্ষককে সম্মান ও ভালোবাসা জানানোর বিরল এক অধ্যায়।
ভিওডি বাংলা/জা








মন্তব্য