আমেরিকার ২৫০ বছর: আশীর্বাদপুষ্ট এক জাতির অভিযাত্রা

জীবনে সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যগুলোর একটি হলো আমেরিকায় জন্ম নেওয়া—এ কথা বহুবার বলা হয়েছে। আমি এর সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।
আমাদের প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের দূরদর্শিতা, প্রজন্মের পর প্রজন্ম দেশপ্রেমিকদের আত্মত্যাগ এবং সাংবিধানিক ব্যবস্থার দৃঢ়তার কারণেই এই নবীন রাষ্ট্র শুধু ২৫০ বছর টিকে থাকেনি; বরং বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বাধীন, সবচেয়ে সমৃদ্ধ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী দেশে পরিণত হয়েছে।
একজন খ্রিস্টান হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, এই যাত্রায় ঈশ্বরের বিশেষ অনুগ্রহ ছিল। একই সঙ্গে আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি, আমাদের সাংবিধানিক কাঠামোর ভিত্তি যে ইহুদি-খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ, সেটিই যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ।
সব মানুষ জন্মগতভাবে কিছু অবিচ্ছেদ্য ও ঈশ্বরপ্রদত্ত অধিকারের অধিকারী—এই ধারণাটি মূলত বাইবেলভিত্তিক। একইভাবে, মানুষের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে সরকারকে কখনো পূজার বস্তু নয়, বরং স্বাধীন ও আত্মশাসিত জনগণের সেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ধারণাও সেই মূল্যবোধ থেকেই এসেছে।
এই বিশ্বাসই আমাদের অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের ইউরোপীয় রাজতন্ত্র এবং বিংশ শতকের কমিউনিস্ট ও ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র থেকে আলাদা করেছে। স্বাধীন থাকতে চাইলে এই আদর্শ আমাদের অবশ্যই ধরে রাখতে হবে।
প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান একবার বলেছিলেন, “স্বাধীনতা কখনোই বিলুপ্তি থেকে এক প্রজন্মের বেশি দূরে নয়।” তাই আমাদের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শে অটল থাকতে হবে এবং দেশে-বিদেশে সেগুলো রক্ষায় সদা প্রস্তুত থাকতে হবে।
আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হয়েছি কারণ আমরা নির্দ্বিধায় আমাদের স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছি, সামরিক শক্তির মাধ্যমে শান্তি নিশ্চিত করেছি, মুক্তবাজার ও মুক্তবাণিজ্যকে সমর্থন করেছি এবং এমন সব জোট গড়ে তুলেছি যা এই সাফল্যকে আরও শক্তিশালী করেছে। ইতিহাস বলে, যখনই আমরা এই দায়িত্ব থেকে সরে এসেছি, তখনই বিশ্বে অস্থিরতা বেড়েছে।
আমাদের পররাষ্ট্রনীতি এমন বিশ্বাসের ওপর দাঁড়ানো উচিত যে, শুধু আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাই রক্ষার যোগ্য নয়; আমেরিকা বিশ্বের জন্য একটি আশীর্বাদ এবং স্বাধীনতার আলোকবর্তিকা। রাজনৈতিক বাম ও ডান—উভয় দিকেই এমন কিছু কণ্ঠ রয়েছে যারা আমেরিকার এই স্বাতন্ত্র্যকে অস্বীকার বা খাটো করতে চায়। আমি বিশ্বাস করি, সেটিই পতনের পথ।
আজ যখন পশ্চিমা বিশ্বের অনেক মিত্ররাষ্ট্র নিজেদের শক্তি ও ঐতিহ্য নিয়ে সংশয়ে ভুগছে, তখনও অধিকাংশ আমেরিকান সেই মূল্যবোধে বিশ্বাস করে, যা এই দেশকে মহান করেছে। প্রয়োজনে তারা সেই আদর্শ রক্ষায় ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুত। তারাই নিশ্চিত করবে, যুক্তরাষ্ট্র আগামী দিনেও সমৃদ্ধ থাকবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পৃথিবীর সবচেয়ে কম স্বাধীন কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ আমার হয়েছে। আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নেই, সেখানে সমাজ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধীনে নিশ্চিত হওয়া এই মৌলিক স্বাধীনতাগুলোকে আমি কখনোই স্বাভাবিক বলে ধরে নিই না।
আজ যখন বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতা চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন দেশে এবং দেশের বাইরে এই মৌলিক অধিকারগুলো রক্ষা করা আমাদের স্বার্থেরও বিষয়, আবার নৈতিক দায়িত্বও। নাইজেরিয়ার নির্যাতিত খ্রিস্টান, চীনের উইঘুর মুসলিম কিংবা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সংগ্রামরত ইরানের জনগণের পাশে দাঁড়ানো সেই দায়িত্বেরই অংশ।
নিজের মূল্যবোধে অটল এবং শত্রুদের নিরুৎসাহিত করতে সক্ষম একটি শক্তিশালী আমেরিকাই দেশে ও বিশ্বের স্বাধীনতার সর্বোত্তম নিশ্চয়তা।
স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তিতে আমাদের নতুন করে অঙ্গীকার করতে হবে, যেন আমরা আমাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য এমন একটি দেশ রেখে যেতে পারি, যা প্রতিষ্ঠাতা নেতাদের আত্মনির্ভরতা ও শৃঙ্খলাবদ্ধ স্বাধীনতার আদর্শে অটল থাকবে। ফরাসি চিন্তাবিদ আলেক্সিস দ্য তকভিল বলেছিলেন, “আমেরিকার মহত্ত্ব অন্য জাতির চেয়ে বেশি জ্ঞানী হওয়ায় নয়; বরং নিজেদের ভুল শুধরে নেওয়ার সক্ষমতায়।”
চীনের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রণহীন জাতীয় ঋণ—এসব সমস্যার মোকাবিলায় আমাদের সেই মনোভাবই কাজে লাগাতে হবে, যাতে আগামী প্রজন্মও ‘আমেরিকান ড্রিম’ বাস্তবায়নের সুযোগ পায়।
আমি এসব সমস্যা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন। তবুও আমি বিশ্বাস করি, আমেরিকার সেরা সময় এখনও সামনে, পেছনে নয়। আমরা তখনই আমাদের প্রজাতন্ত্র হারাতে পারি, যখন নিজেদের ওপর আস্থা হারাব এবং ঈশ্বর আমাদের যে আশীর্বাদ দিয়েছেন, তার যোগ্য নই বলে বিশ্বাস করতে শুরু করব।
আমি মনে করি না, আমরা সেই ভুল করব। কেন? শুধু এজন্য নয় যে আমরা সব সময় মহান প্রেসিডেন্ট বা কংগ্রেস সদস্য নির্বাচন করব—কখনো করব, কখনো করব না। আবার সুপ্রিম কোর্ট সব সময় নিখুঁত সিদ্ধান্ত দেবে বা সাংবাদিকেরা একদিন হঠাৎ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হয়ে উঠবেন—এমন বিশ্বাসও আমার নয়।
বরং আমি আগামী ২৫০ বছরের আমেরিকান মহত্ত্বে বিশ্বাস করি আমেরিকার জনগণের দৃঢ়তা, অধ্যবসায় এবং চরিত্রের কারণে। তারাই স্থানীয় পরিষদের নির্বাচনে দাঁড়ায়, স্কুল বোর্ডে কাজ করে, শিশুদের খেলাধুলার জন্য অনুদান দেয়, গির্জার স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে অংশ নেয়, ছোট ব্যবসা গড়ে তোলে, কঠোর পরিশ্রম করে, পরিবারকে রক্ষা করে এবং সন্তানদের সুশিক্ষায় বড় করে তোলে।
আমেরিকার স্বাতন্ত্র্যের প্রকৃত ভিত্তি এটাই। এই মূল্যবোধগুলো আজও অপরিবর্তিত এবং এটাই আমেরিকার অনন্য রাষ্ট্রগঠনের পরীক্ষার সবচেয়ে বড় শক্তি।
প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন বলেছিলেন, “মানুষের ভাগ্য পরিচালনাকারী অদৃশ্য শক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের চেয়ে বেশি বাধ্য আর কোনো জাতি হতে পারে না। স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের প্রতিটি অগ্রযাত্রায় ঐশ্বরিক অনুগ্রহের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে।”
গত ২৫০ বছর ধরে ঈশ্বর এই মহান জাতিকে আশীর্বাদ করেছেন। আগামী ২৫০ বছরেও তিনি যেন আমেরিকাকে একইভাবে আশীর্বাদ করে যান—এই প্রার্থনাই করি।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের ৭০তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ভিওডি বাংলা/এফএ








মন্তব্য