১১৮ বছরের সীমান্ত বিরোধের অবসান, নতুন সম্পর্কে স্পেন-জিব্রাল্টার

ব্রেক্সিট-পরবর্তী দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে স্পেন ও জিব্রাল্টারের মধ্যকার ১১৮ বছরের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হচ্ছে। ১৫ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকা এই ব্যবস্থার ফলে দুই অঞ্চলের মানুষের চলাচল হবে অনেক সহজ, যা স্থানীয়দের মতে একটি "ঐতিহাসিক পরিবর্তন"।
জিব্রাল্টার যুক্তরাজ্যের একটি স্বশাসিত ওভারসিজ টেরিটরি, যার জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। এতদিন সেখানে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে দীর্ঘ যানজট ও অপেক্ষা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার স্প্যানিশ নাগরিক কাজের জন্য সীমান্ত পার হয়ে জিব্রাল্টারে যাতায়াত করেন।
স্পেনের লা লিনিয়া দে লা কনসেপসিওন শহরের বাসিন্দা শিল্পি চোত্রানি প্রতিদিন সাইকেলে করে জিব্রাল্টারে কর্মস্থলে যান। তাঁর ভাষায়, "আমাদের মধ্যে সীমান্ত থাকা একেবারেই অযৌক্তিক। একটি বেড়া কখনোই মানুষকে আলাদা করতে পারে না।"
তিনি বলেন, সীমান্ত তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্পেন ও জিব্রাল্টার—উভয় পক্ষের মানুষের জন্যই ইতিবাচক হবে এবং এই পদক্ষেপ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল।
ব্রেক্সিটের পর সমঝোতা
যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার পর জিব্রাল্টারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তা ছিল। কারণ, স্থলপথে জিব্রাল্টারের একমাত্র সীমান্ত ইইউ সদস্য স্পেনের সঙ্গে।
বহু বছরের আলোচনার পর যুক্তরাজ্য, স্পেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছে। এর আওতায় জিব্রাল্টার ইউরোপীয় কাস্টমস ইউনিয়ন ও শেনজেন মুক্ত ভ্রমণ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত হবে।
এর ফলে স্পেন ও জিব্রাল্টারের মধ্যে নিয়মিত সীমান্ত তল্লাশি থাকবে না। তবে শেনজেন অঞ্চলের বাইরের দেশ—যেমন যুক্তরাজ্য—থেকে আসা যাত্রীদের জিব্রাল্টারের বিমানবন্দর ও বন্দরে স্প্যানিশ ও জিব্রাল্টারের কর্মকর্তাদের কাছে পাসপোর্ট দেখাতে হবে।
অর্থনীতিতে বড় প্রভাবের আশা
বিশ্বের মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে জিব্রাল্টার অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল হলেও সীমান্তের ওপারের লা লিনিয়া স্পেনের সবচেয়ে দরিদ্র এলাকাগুলোর একটি। সেখানে বেকারত্বের হার প্রায় ৩০ শতাংশ।
লা লিনিয়ার মেয়র হুয়ান ফ্রাঙ্কো বলেন, ১৯০৮ সাল থেকে সীমান্তে বেড়া রয়েছে। এটি তুলে দেওয়া একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
তিনি জানান, শহরের গড় একটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আয় আসে জিব্রাল্টারের গ্রাহকদের কাছ থেকে। তাই সীমান্ত সহজ হলে দুই অঞ্চলের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
জিব্রাল্টারের জন্য ‘নতুন ভোর’
জিব্রাল্টারের মুখ্যমন্ত্রী ফ্যাবিয়ান পিকার্ডো এই চুক্তিকে "বিশাল পরিবর্তন" হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, গত আট প্রজন্ম ধরে সীমান্তের বিধিনিষেধ জিব্রাল্টারের মানুষের জীবনের অংশ ছিল। নতুন ব্যবস্থার ফলে মানুষ ও পণ্যের চলাচল অনেক বেশি সহজ হবে।
পিকার্ডোর মতে, এতে পর্যটক ও ক্রেতার সংখ্যা বাড়বে, ব্যবসা সম্প্রসারিত হবে এবং সীমান্তে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করতে হবে না।
তিনি বলেন, "এটি মানবিক সম্পর্ক, ব্যবসা এবং সীমান্তে কর্মরত মানুষের জন্য নতুন এক ভোরের সূচনা করবে।"
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেসও এই চুক্তিকে জিব্রাল্টারের জন্য "একটি নতুন যুগের সূচনা" বলে আখ্যা দিয়েছেন।
নতুন নিয়ম ও কর
তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন কিছু বাধ্যবাধকতাও আসছে।
এখন থেকে জিব্রাল্টারে বিক্রি হওয়া সব পণ্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানদণ্ড মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি এতদিন ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) না থাকলেও নতুন একটি লেনদেন কর চালু হচ্ছে, যা আমদানি শুল্কের পরিবর্তে কার্যকর হবে।
প্রথম বছরে এই করের হার হবে ১৫ শতাংশ, যা ধীরে ধীরে বেড়ে ১৭ শতাংশে পৌঁছাবে। কিছু পণ্যে আবগারি শুল্কও বাড়ানো হবে।
জিব্রাল্টারের ব্যবসায়ী জন আইসোলা বলেন, দীর্ঘদিনের ব্রেক্সিট অনিশ্চয়তার অবসান হওয়ায় ব্যবসায়ীরা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে নতুন কর ও কাগজপত্রের নিয়মের কারণে ব্যবসা পরিচালনা কিছুটা জটিল হবে।
তাঁর মতে, যুক্তরাজ্য বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশ থেকে পণ্য আমদানিকারকদের জন্য নতুন নিয়ম মানিয়ে নেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
এদিকে সীমান্ত তুলে দেওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাতের বেলায় সীমান্তের বেড়া অপসারণের কাজ চলছে।
দীর্ঘ ইতিহাসে যুদ্ধ, অবরোধ ও সার্বভৌমত্বের বিরোধের সাক্ষী জিব্রাল্টার এবার প্রবেশ করতে যাচ্ছে এক নতুন অধ্যায়ে, যেখানে সীমান্তের পরিবর্তে গুরুত্ব পাবে মানুষের অবাধ যাতায়াত, বাণিজ্য এবং পারস্পরিক সহযোগিতা।
ভিওডি বাংলা/এফএ








মন্তব্য