গাজার নিহত ৩০০ শিশুর নাম সেলাই করলেন ডায়ানা

গাজার যুদ্ধ শুধু ধ্বংসস্তূপ, বোমাবর্ষণ আর মৃত্যুর পরিসংখ্যানের গল্প নয়; এটি হাজারো শিশুর অসমাপ্ত জীবনের গল্পও। সেই হারিয়ে যাওয়া শিশুদের স্মরণে এক ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের শিল্পী ডায়ানা উইলিয়ামস। একটি পুরোনো খ্রিষ্টধর্মীয় শিশুর বাপ্তিস্মের (ক্রিস্টেনিং) পোশাকে তিনি লাল সুতো দিয়ে গাজায় নিহত ৩০০ শিশুর নাম সূচিকর্মে তুলে ধরেছেন।
শিল্পকর্মটির নাম ‘নো দেয়ার নেমস’ (Know Their Names)। আল জাজিরার তৈরি নিহত ফিলিস্তিনিদের নামভিত্তিক তথ্যভান্ডার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এই কাজটি করেন। তার লক্ষ্য, যুদ্ধের ভয়াবহতাকে শুধু সংখ্যা নয়, মানুষের নাম ও পরিচয়ের মাধ্যমে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা।
ডায়ানা উইলিয়ামস বলেন, একটি শিশুর বাপ্তিস্মের পোশাক নিষ্পাপতা ও পবিত্রতার প্রতীক। তাই তিনি এটিকেই শিল্পকর্মের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
"আমি এই পোশাকটিকে একটি খালি ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করেছি," বলেন তিনি।
চার মাস ধরে ধৈর্যের সঙ্গে তৈরি করা এই শিল্পকর্মে এক বছরের কম বয়সী ৩০০ শিশুর নাম লাল সুতোয় সেলাই করা হয়েছে। নামগুলোর মধ্যে রয়েছে সারা, ইলিয়াস, মাই, মোনা-সহ অসংখ্য শিশু, যাদের জীবন যুদ্ধের আগেই থেমে গেছে।
রক্তের প্রতীক হয়ে উঠেছে পোশাকের নিচের অংশ
শুধু নাম লেখাতেই থেমে থাকেননি ডায়ানা। পোশাকের নিচের অংশ বিশেষ রাসায়নিক দিয়ে ক্ষয় করে ছেঁড়া ও জীর্ণ করে তুলেছেন। তার ভাষায়, "আমি চেয়েছি পোশাকটি যেন সেই কঠিন বাস্তবতাকে প্রকাশ করে, যেখানে গাজার মানুষ বাস করছে।"
তিনি বলেন, পোশাকটি ঝুলিয়ে রাখলে নিচের দিকে ঝুলে থাকা লাল সুতো দর্শকদের চোখকে নিচের দিকে টেনে নেয়। দূর থেকে এটি অনেকটা রক্তের পুকুরের মতো দেখায়, যা গভীর শোক ও ক্ষতির অনুভূতি সৃষ্টি করে।
"আমি কিছু একটা করতেই চেয়েছি"
ডায়ানা উইলিয়ামস একজন অবসরপ্রাপ্ত শিল্পকলার শিক্ষক। তিন সন্তানের মা এবং দুই নাতি-নাতনির দাদি এই শিল্পী বলেন, গাজার মায়েদের সন্তান হারানোর দৃশ্য তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
কণ্ঠ ধরে রেখে তিনি বলেন, "বিশ্বের এত রাজনীতিবিদ নিজেরাও বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানি। তাদের নিজেদের পরিবারে শিশু রয়েছে। তারপরও কীভাবে এই হত্যাযজ্ঞ চলতে দেওয়া হচ্ছে, আমি তা বুঝতে পারি না।"
তার অভিযোগ, সাধারণ মানুষ যেখানে গাজার মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখাচ্ছেন, সেখানে বিশ্বনেতাদের অনেকেই নীরব রয়েছেন।
"গাজার ঘটনা আমাকে যতটা স্পর্শ করেছে, অন্য কিছু কখনো করেনি। আমার মনে হয়েছে, আমাকে কিছু একটা করতেই হবে," বলেন তিনি।
গাজার খ্রিষ্টানদের দুর্ভোগও অনুপ্রেরণা
ডায়ানা জানান, গাজার খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের দুর্দশাও তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। যুদ্ধের মধ্যে সন্তান মারা যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক বাবা-মা নবজাতকদের দ্রুত বাপ্তিস্ম সম্পন্ন করছিলেন—এই সংবাদ তাকে আলোড়িত করে।
সেই কারণেই তিনি বাপ্তিস্মের পোশাককে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বেছে নেন।
পুরস্কার জিতেছে শিল্পকর্ম
ওয়েলসের কারনারভনের গালেরি কারনারভনে প্রদর্শিত হওয়ার পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে এই শিল্পকর্মটি দর্শক ভোটে বিশেষ পুরস্কার লাভ করে।
পুরস্কারের অর্থ তিনি মেডিক্যাল এইড ফর প্যালেস্টিনিয়ানস-এর কাছে দান করেন।
পরে এটি ওয়েলসের আরও কয়েকটি প্রদর্শনীতে স্থান পায় এবং দেশটির অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক উৎসব ন্যাশনাল আইস্টেডফড-এ প্রদর্শনের জন্যও সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে।
এবার প্যারিস ও নিউইয়র্কে
চলতি বছরের শেষ দিকে শিল্পকর্মটি ফ্রান্সের প্যারিসে প্রদর্শিত হবে। পাশাপাশি নিউইয়র্কের একটি বিলবোর্ডেও এটি প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে বিশ্বের আরও বেশি মানুষ গাজার শিশুদের স্মরণ করতে পারেন।
ডায়ানা উইলিয়ামস বলেন, "এই খালি পোশাকটি আসলে যে শূন্যতা ও অপূরণীয় ক্ষতির অনুভূতি তৈরি করে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি, এটি গাজায় কী ঘটছে, সে বিষয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা শুরু করতে সাহায্য করবে।"
জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ২০ হাজারেরও বেশি শিশু নিহত হয়েছে। সেই বাস্তবতাকেই শিল্পের ভাষায় স্মরণীয় করে রাখতে চেয়েছেন ওয়েলসের এই শিল্পী।
ভিওডি বাংলা/এফএ








মন্তব্য