নবম জাতীয় পে-স্কেলের অপেক্ষা আরও বাড়ল

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আরও কিছুটা দীর্ঘ হচ্ছে। এ বিষয়ে সুপারিশ চূড়ান্ত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি এখনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশ এবং পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য সরকারি চাকরিজীবীদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত কমিটি সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আরেক দফা বৈঠক করেছে। তবে দীর্ঘ আলোচনার পরও বাস্তবায়নসংক্রান্ত সুপারিশমালা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে আবারও বৈঠকে বসে বাকি বিষয়গুলো নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সরকারের বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নতুন পে-স্কেল একবারে কার্যকর করার পরিবর্তে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে মূল বেতন বা বেসিক বৃদ্ধি কার্যকর করা হতে পারে। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা যুক্ত করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ২১ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এই বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন। যদিও প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত কিছু জটিলতা থাকায় বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে সময় লাগছে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হলেও এটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর দেখানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। সে ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পরবর্তীতে বকেয়া বেতন ও প্রাপ্য সুবিধা একসঙ্গে পেতে পারেন। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নজরেও এসেছে। সম্প্রতি ঢাকা সফররত সংস্থাটির একটি প্রতিনিধি দল সরকারের সঙ্গে বৈঠকে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় আকারের বেতন বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আইএমএফের মতে, বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক চাপের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের বড় পরিসরে বেতন বাড়ানো হলে বাজারে চাহিদা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি সরকারের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
বৈঠকে জাতীয় বেতন কমিশনের প্রস্তাবিত ২০টি গ্রেড নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। শুধু বেতনের অঙ্ক নয়, গ্রেডের সংখ্যা ও বিন্যাসেও পরিবর্তনের সুযোগ আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, সর্বোচ্চ বা প্রথম গ্রেডের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের বেতন ধরা হয়েছে ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা। তবে অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এসব অঙ্কে পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
অর্থ বিভাগের সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার জানিয়েছেন, সচিব কমিটি স্বাধীনভাবে তাদের কাজ করছে। তারা কতটি বৈঠক করবে বা কত সময় নেবে, সেটি তাদের নিজস্ব বিষয়। কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও কিছু সময় লাগতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এ খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।
এ ছাড়া নতুন পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়ন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুবিধা এবং পেনশনভোগীদের বিভিন্ন আর্থিক সমন্বয়ের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব আহরণে চাপ, বাজেট ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতির মতো বিষয়গুলো নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের মতে, পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান নিশ্চিত না করে একবারে পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়ন করলে সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতিও আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ হুবহু বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কম। ফলে কিছু গ্রেডের মূল বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধায় সমন্বয় বা কাটছাঁট করা হতে পারে।
এ কারণে সচিব কমিটি এমন একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব তৈরির চেষ্টা করছে, যাতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন বৃদ্ধি পান, আবার সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপও না পড়ে।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল।
সেই প্রস্তাবে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়।
তবে পরবর্তী সময়ে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় বর্তমান সরকার সেই সুপারিশ পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি রাজস্ব আয়, বাজেট ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি, সরকারি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নতুন একটি খসড়া প্রস্তুত করছে।
ভিওডি বাংলা/জা








মন্তব্য