• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

মেট্রোরেলে ৭৩০ বেয়ারিং প্যাডে ত্রুটি

নিজস্ব প্রতিবেদক    ১৬ জুলাই ২০২৬, ১১:২০ এ.এম.
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর উত্তরা উত্তর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলাচলকারী এমআরটি লাইন-৬-এ কাঠামোগত ও পরিচালনগত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে। স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরো রুটে ব্যবহৃত বেয়ারিং প্যাডের প্রায় ২৩ দশমিক ২৮ শতাংশ, অর্থাৎ ৭৩০টি ত্রুটিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি ৪৬টি পিয়ার হেড এবং অন্তত ২০টি বক্স গার্ডারে ফাটলের অস্তিত্বও ধরা পড়েছে।

প্রতিবেদনে এসব ত্রুটিকে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে না দেখে একটি সম্মিলিত নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। কমিটির মতে, বিদ্যমান পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামোর স্থায়িত্ব এবং যাত্রী নিরাপত্তা-উভয় ক্ষেত্রেই উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

গত বছরের ২৬ অক্টোবর রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় একটি বেয়ারিং প্যাড নিচে পড়ে এক পথচারীর মৃত্যুর পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ওই ঘটনার পর হাইকোর্ট এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) নয় সদস্যের একটি স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট কমিটি গঠন করে।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বাধীন কমিটি বিভিন্ন পর্যায়ে পরিদর্শন, নথি পর্যালোচনা এবং কারিগরি বিশ্লেষণ শেষে চলতি বছরের মে মাসে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে বেয়ারিং প্যাডের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ৪৪২, ৪৪৬ ও ৪৪৮ নম্বর পিলারে ট্রেন চলাচলের সময় অস্বাভাবিক ধাক্কার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া ৪২৩ নম্বর পিলারে একটি বেয়ারিং প্যাড স্থানচ্যুত হওয়ার তথ্যও নথিভুক্ত হয়েছে।

কমিটি জানিয়েছে, বেয়ারিং প্যাডের পাশাপাশি ৪৬টি পিয়ার হেড এবং ২০টি বক্স গার্ডারে ফাটল রয়েছে। কোথাও কোথাও কংক্রিটের অংশ খসে পড়ার ঘটনাও নজরে এসেছে।

বিশেষভাবে ৩৪১ নম্বর পিলারের ফাটলকে উচ্চঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে। কারণ, সেখানে ফাটলের মাত্রা নির্ধারিত নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে। অথচ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ক্র্যাক গেজ স্থাপন কিংবা প্রকৌশলগত মানদণ্ড অনুসারে স্থায়ী মেরামতের কোনো কার্যকর উদ্যোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অডিট কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব সমস্যার পেছনে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী, নির্মাণকাজের ত্রুটি অথবা নকশাগত দুর্বলতা-সবই সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ কারিগরি বিশ্লেষণের মাধ্যমে মূল কারণ নিশ্চিত করা হয়নি।

এছাড়া ত্রুটিপূর্ণ অংশগুলো প্রতিস্থাপন বা দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য কোনো সমন্বিত কর্মপরিকল্পনারও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে অস্বাভাবিক কম্পন, ট্র্যাকের ত্রুটি এবং বেয়ারিং প্যাডের সমস্যার কারণে যাত্রীদের ভ্রমণ স্বাচ্ছন্দ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

মেট্রোরেলের মূল নকশা অনুযায়ী ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে ১০টি অংশে টেম্পোরারি স্পিড রেস্ট্রিকশন (টিএসআর) কার্যকর রয়েছে। এসব এলাকায় ট্রেন ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করছে। কোনো কোনো অংশে গতি কমে ৪৪ থেকে ৪৭ কিলোমিটার পর্যন্ত নেমে আসছে।

কমিটির মতে, মূল ত্রুটি দূর না করে কেবল গতি কমিয়ে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান হতে পারে না।

পরিচালনগত সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ট্রেনের ‘আন্ডারশুটিং’ সমস্যা। অস্বাভাবিক ব্রেকিংয়ের কারণে অনেক সময় ট্রেন নির্ধারিত স্টপিং পয়েন্টের আগেই থেমে যাচ্ছে।

এর ফলে ট্রেনের দরজা ও প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোরের অবস্থানের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে। এতে যাত্রীদের পড়ে যাওয়া কিংবা আটকে পড়ার মতো দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

এই সমস্যার কারণে ইতোমধ্যে পাঁচটি ট্রেনসেট রাজস্বভিত্তিক সেবা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিরাপত্তা অডিটে ট্রেনের চাকার অতিরিক্ত ক্ষয়, সম্ভাব্য ফাটল, দরজা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটি এবং ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমে ধারাবাহিক বৈদ্যুতিক স্পার্কিংয়ের বিষয়ও উঠে এসেছে।

এছাড়া তিন বছরের বেশি সময় ধরে ডিপো এলাকায় ট্র্যাক বসে যাওয়ার সমস্যা অব্যাহত রয়েছে। নিয়মিত মেরামত করা হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে কমিটি জানিয়েছে।

প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, পুরো মেট্রোরেল ব্যবস্থায় এখনো কার্যকর রিয়েল-টাইম স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং প্রযুক্তি চালু হয়নি।

ফলে পিলারের ফাটল, বেয়ারিং প্যাডের স্থানচ্যুতি, ট্র্যাকের অস্বাভাবিক বসে যাওয়া কিংবা অতিরিক্ত কম্পনের মতো বিষয়গুলো তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ছোট ত্রুটি বড় ঝুঁকিতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অডিট কমিটির সদস্য ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, বর্তমানে বেয়ারিং প্যাডে ব্র্যাকেট সংযোজন, ট্রেনের গতি কমানো এবং অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণের মতো যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলো মূলত সাময়িক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ। এগুলোকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

তার মতে, সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে প্রকৌশলগতভাবে টেকসই সমাধান বাস্তবায়ন করা জরুরি।

ভিওডি বাংলা/জা

 


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ছবি: সংগৃহীত
১০ হাজার পুলিশ নিয়োগ দেবে সরকার
ছবি:সংগৃহীত
আজ শুরু হচ্ছে রথযাত্রা
ছবি: ভিওডি বাংলা গ্রাফিক্স
জুলাই শহীদ দিবস: একটি নাম, একটি ইতিহাস