ভিসা জালিয়াতিতে ইতালি পাচার, ৫৬ পাসপোর্টসহ গ্রেপ্তার ৭

প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য নারীকে ইতালিতে পাঠানোর মতো ভয়াবহ ভিসা জালিয়াতি ও মানবপাচারের অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে থাকা ৫৬টি পাসপোর্ট, সরকারি-বেসরকারি ও বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবহৃত ১৫৩টি সিল, একটি এম্বোস সিল, তিনটি সিপিইউ, একটি ল্যাপটপ এবং নগদ দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।
সিআইডি জানিয়েছে, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত ভিসাধারীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানোর মতো সংগঠিত অপরাধে জড়িত ছিল।
সিআইডির মানবপাচার শাখা (টিএইচবি) গত ২০ জুলাই রাজধানীর গুলশান-১ এলাকায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের আটক করে। পরে তাদের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০২৬ এবং দণ্ডবিধির প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও জালিয়াতিসহ একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন, মো. বেলায়েত হোসেন (৪০), নাজমুল হাসান (১৯), মেহেদী হাসান (৩৭), মো. সোলাইমান সুমন (৩২), ফজলে রাব্বী (২৭), মো. তৌহিদুর রহমান (২৪) এবং কাওসার হোসেন (৪২)।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ভুক্তভোগী এক নারী তার স্বামী ও চার সন্তানকে নিয়ে ইতালিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে দীর্ঘদিন ধরে ভিসা পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তার স্বামী আগে থেকেই ইতালিতে অবস্থান করছিলেন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পাসপোর্ট ইতালির দূতাবাসে জমা দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে যায়। এ সময় তার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলে দূতাবাস থেকে নবায়নের জন্য যোগাযোগ করা হয়।
পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে গেলে নাজমুল হাসান নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। নিজেকে দ্রুত পাসপোর্ট নবায়ন ও ইতালির ভিসা করিয়ে দেওয়ার সক্ষম ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি ওই নারীকে গুলশানের একটি ট্রাভেলস প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যান। সেখানে প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় মো. বেলায়েত হোসেনকে।
এরপর অভিযুক্তরা ভিসা নিশ্চিত করে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার সঙ্গে আর্থিক চুক্তি করে।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল ভুক্তভোগীর মোবাইলে দূতাবাস-সংক্রান্ত একটি বার্তা আসে। অভিযুক্তদের পরামর্শে তিনি দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন।
দূতাবাস থেকে বের হওয়ার পর অভিযুক্তরা তার কাছে চুক্তির টাকা দাবি করে। তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ দিতে না পারায় তারা জোর করে তার পাসপোর্ট নিজেদের কাছে রেখে দেয়।
পরে পাসপোর্ট ফেরত এবং ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে-এমন আশ্বাসে ওই নারী অভিযুক্তদের দেওয়া ব্যাংক হিসাবে ১৯ এপ্রিল দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ১১ মে আরও এক লাখ ৯০ হাজার টাকা জমা দেন। মোট চার লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধের পর তাকে পাসপোর্ট ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ইতালিতে থাকা স্বামী স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকিটের ব্যবস্থা করেন।
নির্ধারিত দিনে তারা বিমানবন্দরে গিয়ে ইমিগ্রেশন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে চাইলে কর্মকর্তারা জানান, ওই পাসপোর্টে থাকা ইতালির ভিসা ব্যবহার করে ইতোমধ্যে অন্য এক নারী ২৪ এপ্রিল ইতালিতে প্রবেশ করেছেন।
এ তথ্য শুনে ভুক্তভোগী বুঝতে পারেন, তার পাসপোর্ট ও ভিসা জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যবহার করে অন্য কাউকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে তার কাছ থেকে নেওয়া বিপুল অর্থও প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
পরে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে তিনি সিআইডির মানবপাচার শাখায় অভিযোগ করেন।
অভিযোগ পাওয়ার পর সিআইডি দ্রুত তদন্ত শুরু করে। গোয়েন্দা তথ্য ও প্রাথমিক অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তে জানা গেছে, এই চক্র বিদেশে যাওয়ার আগ্রহী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে ইতালির ভিসা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিত। এরপর বিভিন্ন অজুহাতে তাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট নিজেদের হেফাজতে রাখত।
পরবর্তীতে ভিসা-সংক্রান্ত জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানো হতো। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা ছিল তাদের নিয়মিত কৌশল।
উদ্ধার হওয়া আলামতে মিলেছে বড় নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত
সিআইডির ভাষ্য, অভিযানে উদ্ধার হওয়া ৫৬টি পাসপোর্ট এবং ১৫৩টি বিভিন্ন ধরনের সিল থেকে ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে ভিসা জালিয়াতি ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত।
জব্দ করা কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও অন্যান্য আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
এছাড়া উদ্ধার হওয়া এম্বোস সিল, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিল এবং ডিজিটাল ডিভাইস বিশ্লেষণ করে চক্রটির দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
মূলহোতার বিরুদ্ধে আগেও ছিল অভিযোগ
প্রাথমিক তদন্তে সিআইডি জানতে পেরেছে, গ্রেপ্তার হওয়া মো. বেলায়েত হোসেনই এই চক্রের মূলহোতা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে একই কৌশলে অন্তত ৩০ জনকে ইতালিতে পাঠানোর সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ক্ষেত্রে প্রত্যেকের কাছ থেকেই বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এছাড়া একই ধরনের অপরাধের অভিযোগে ২০২৪ সালে বিমানবন্দর থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। সেই মামলার বিচারও চলমান।
সিআইডি জানিয়েছে, মামলার তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। জব্দ করা পাসপোর্ট, সিল ও ডিজিটাল ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষা, অভিযুক্তদের আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্য অন্যান্য ভুক্তভোগী ও সহযোগীদের শনাক্তে কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও অর্থ লেনদেনের উৎস-গন্তব্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন কিংবা ভ্রমণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া পাসপোর্ট বা অর্থ হস্তান্তর না করার আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি।
ভিওডি বাংলা/জা








মন্তব্য