নড়ে উঠল মোদির গদি
ভারতে প্রশ্নফাঁস থেকে যেভাবে জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিল সিজেপি

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে 'চলো সংসদ' কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সোমবার যে বিক্ষোভ হয়েছে, তা শুধু একটি রাজনৈতিক সমাবেশ নয়; বরং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদের অন্যতম বড় জনঅসন্তোষের প্রকাশ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করা ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এখন লাখো তরুণের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। সোমবার সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর দিন হাজারো আন্দোলনকারী সংসদের দিকে পদযাত্রার চেষ্টা করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, ব্যারিকেড ও লাঠিচার্জ করে তাদের ঠেকানোর চেষ্টা করে। পরে আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে বাধ্য হয় কেন্দ্রীয় সরকার।
কীভাবে শুরু হলো আন্দোলন
সিজেপির দাবি, ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষায় অনিয়ম এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের নিট-ইউজি (NEET-UG) মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস দেশজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
সংগঠনটির অভিযোগ, প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে অন্তত ১২ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবরও উঠে এসেছে। আন্দোলনকারীদের মতে, এসব ঘটনা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, শিক্ষা ব্যবস্থায় গভীর দুর্নীতির প্রতিফলন।
কেন ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ঘিরে ক্ষোভ
আন্দোলনের মূল দাবি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
সিজেপির অভিযোগ, নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁস ছাড়াও সিবিএসই দ্বাদশ শ্রেণির ফল প্রকাশসংক্রান্ত পোর্টালের বিশৃঙ্খলা এবং সিইউইটি (CUET) পরীক্ষায় বিলম্বের মতো ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে শিক্ষামন্ত্রীকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে দায়ী করা হচ্ছে।
কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল আন্দোলন
প্রথমদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক এই আন্দোলন দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়, কোচিং সেন্টার ও চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোরও সমর্থন পায়।
লাদাখের পরিবেশকর্মী ও অনশনরত আন্দোলনকারী সোনম ওয়াংচুককে শনিবার জোর করে হাসপাতালে নেওয়ার ঘটনাও আন্দোলনে নতুন গতি আনে। ওয়াংচুক আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে অনশন শুরু করেছিলেন। তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তরের পর আরও বেশি মানুষ দিল্লির যন্তর-মন্তরে জড়ো হন।
দিল্লিতে কী ঘটেছে
সোমবার ভোর থেকেই হাজারো আন্দোলনকারী যন্তর-মন্তরে অবস্থান নেন। সংসদের দিকে পদযাত্রা শুরু করলে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাদের থামিয়ে দেয়।
রয়টার্সের সাংবাদিকেরা ঘটনাস্থলে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও পুলিশের লাঠিচার্জ প্রত্যক্ষ করেছেন। যদিও দিল্লি পুলিশ বলেছে, তারা পরিস্থিতি "পেশাদারভাবে" সামাল দিয়েছে এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সরকারের অবস্থান
সংঘর্ষের মধ্যেই সিজেপির দুই মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎ প্রকাশ (জে পি) নাড্ডার সঙ্গে বৈঠক করেন।
প্রায় চার ঘণ্টার আলোচনার পর আন্দোলনকারীরা সরকারের কাছে তিন দফা দাবিসংবলিত স্মারকলিপি জমা দেন। জে পি নাড্ডা জানান, আলোচনা সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে হয়েছে এবং তিনি আন্দোলনকারীদের অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে সিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার বিষয়গুলো বিবেচনার আশ্বাস দিলেও এখনো কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তাই দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
সিজেপির আন্দোলনের তিন প্রধান দাবি
১. শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
২. সোনম ওয়াংচুকের মুক্তি এবং তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ প্রত্যাহার।
৩. প্রশ্নপত্র ফাঁস-পরবর্তী আত্মহত্যায় নিহত প্রতিটি শিক্ষার্থীর পরিবারকে এক কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আন্দোলন
ভারতে দীর্ঘদিন ধরেই বেকারত্ব, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম এবং সরকারি চাকরির সংকট নিয়ে তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ককরোচ আন্দোলন সেই অসন্তোষকে একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্মে রূপ দিয়েছে।
সরকারের সঙ্গে আলোচনার পরও আন্দোলনকারীরা অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে এই আন্দোলন ভারতের রাজনীতি এবং শিক্ষা খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স, এনডিটিভি
ভিওডি বাংলা/এমএস








মন্তব্য