• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

কর্ণফুলী টানেলে ১৬১৬ কোটি টাকার অনিয়ম

নিজস্ব প্রতিবেদক    ৫ জুলাই ২০২৬, ০৪:০০ পি.এম.
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম টানেল প্রকল্পে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্বলতার তথ্য উঠে এসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাস্তবায়িত এ মেগাপ্রকল্পে অন্তত ১ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার অনিয়ম ও অস্বচ্ছ ব্যয়ের চিত্র পাওয়া গেছে।

প্রায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে একাধিক আর্থিক অসঙ্গতি, ক্রয়বিধি লঙ্ঘন এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। আইএমইডির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অনিয়ম সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন অর্থবছরে প্রকল্পটির বিরুদ্ধে মোট ৬৮টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়। এর মধ্যে ৪৮টিকে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় পার হলেও এসব আপত্তি নিষ্পত্তি না হওয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে আর্থিক শৃঙ্খলা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। বিশেষ করে অতিরিক্ত ব্যয়, অনুমোদনহীন খরচ এবং অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়গুলো উদ্বেগজনক।

প্রতিবেদনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো গাছ লাগানোর নামে বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ। এতে বলা হয়েছে, ল্যান্ডস্কেপিং ও বৃক্ষরোপণের জন্য প্রায় ৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও প্রকল্পের সংশোধিত ডিপিপি কিংবা চূড়ান্ত সমাপনী প্রতিবেদনে এ ধরনের কাজের কোনো বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আইএমইডির দাবি, মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানেও গাছ লাগানোর কার্যক্রমের অস্তিত্ব মেলেনি। ফলে এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

প্রকল্পের আওতায় নির্মিত একটি বড় সার্ভিস এরিয়াকেও অপ্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছে আইএমইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৫০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ অবকাঠামোর সঙ্গে টানেলের মূল কার্যক্রমের সরাসরি সম্পর্ক নেই।
ওই সার্ভিস এরিয়ায় বাংলো, মোটেল, কনভেনশন সেন্টার, চিকিৎসাকেন্দ্র এবং জাদুঘর নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এসব স্থাপনার সঙ্গে টানেলের সরাসরি সড়ক সংযোগও নেই। এ কারণে পুরো ব্যয়কে অপচয় এবং নীতিগত অনিয়ম হিসেবে আখ্যা দিয়েছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কন্টিনজেন্সি বা আপৎকালীন তহবিল থেকে প্রায় ২২৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যদিও একই ধরনের ব্যয় জেনারেল ফ্যাসিলিটিজ খাতেও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া ২২৪ কোটি টাকার অননুমোদিত মূল্য সমন্বয়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে।

এছাড়া আলাদা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের পরও সুপারভিশন ফি হিসেবে অতিরিক্ত ৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বরাদ্দের বাইরে আরও প্রায় ৯০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। আইএমইডির মতে, সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ না করা এবং চুক্তির শর্ত ভঙ্গের কারণেই এসব অনিয়ম ঘটেছে।

২০১৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রথমে প্রায় ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়। তবে পরবর্তীতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকার বেশি।
অর্থাৎ, প্রকল্পের চূড়ান্ত ব্যয় প্রায় ২৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়। কেন এমন ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি ঘটেছে, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি।
প্রকল্পের অর্থায়নের বড় অংশ এসেছে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংকের ঋণ থেকে। প্রায় ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকার এই ঋণ ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরে পরিশোধ করতে হবে।

সম্পদ ব্যবস্থাপনায়ও বড় ধরনের দুর্বলতার তথ্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। প্রকল্পের আওতায় কেনা ২৯টি গাড়ির মধ্যে মাত্র ৬টি বাংলাদেশ সেতু বিভাগকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ২৩টি গাড়ি এখনও অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে বলে জানিয়েছে আইএমইডি।

এছাড়া বড় প্রকল্পে সার্বক্ষণিক ও অভিজ্ঞ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকলেও কর্ণফুলী টানেলে দায়িত্ব পালনে ঘন ঘন পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। পুরো প্রকল্পকালে অন্তত চারজন প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক পর্যায়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে দুই বছর প্রকল্প পরিচালকের কাজ করেছেন। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে আইএমইডি।
প্রত্যাশার তুলনায় কম যান চলাচল

আইএমইডির প্রতিবেদনে টানেলের আর্থিক কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ২৮ হাজারের বেশি যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।

২০২৩ সালের অক্টোবরে উদ্বোধনের পর প্রথম দিকে প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার যানবাহন চলাচল করলেও ২০২৬ সালের শুরুর দিকে তা কমে প্রায় সাড়ে ৩ হাজারে নেমে আসে।

বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার ছোট যানবাহন টানেল ব্যবহার করছে, যা পূর্বাভাসের মাত্র ১৪ শতাংশ। পণ্যবাহী ভারী যানবাহনের বেশিরভাগই বিকল্প পথ ব্যবহার করছে।

কম যান চলাচলের কারণে টানেলটি এখন আর্থিকভাবে চাপের মুখে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন টানেল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রায় ২২ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। বিপরীতে টোল আদায় থেকে আয় হচ্ছে মাত্র ১২ লাখ টাকার মতো।

ফলে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকা ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় সাড়ে ৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভিওডি বাংলা/জা
 


 


মন্তব্য

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
ছবি: সংগৃহীত
শেখ হাসিনার দেশে ফিরতে আইনি বাধা নেই: চিফ প্রসিকিউটর
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। ছবি: সংগৃহীত
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ইশরাক হোসেন। ছবি: ভিওডি বাংলা
গুমের শিকার পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে নতুন অধিদপ্তরের প্রস্তাব ইশরাকের