• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

অনন্তলোকে আশা ভোঁসলে

বিনোদন ডেস্ক    ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৫২ পি.এম.
ছবি: সংগৃহীত

অনন্তলোকে পাড়ি দিয়েছেন ভারতের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আশা ভোঁসলে।  রোববার (১২ এপ্রিল) দুপুরে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ ৯২ বছর বয়সী এই সুরের রানি।

ছেলে আনন্দ ভোঁসলে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলেন, ‘তিনি আর নেই।  আগামীকাল বিকেল ৪টায় মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে তার শেষকৃত্য হবে।’ 

শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে গত শনিবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে ভর্তি হন উপমহাদেশের এই প্রখ্যাত শিল্পী।

আশার নাতনি জানাই ভোঁসলে এক্সে লিখেছেন, অত্যধিক ক্লান্তি এবং বুকে সংক্রমণের কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

১৯৪৩ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি মারাঠি চলচ্চিত্র মাঝা বাল-এর জন্য তার প্রথম চলচ্চিত্রের গান ‘চলা চলা নাভ বালা’ গেয়েছিলেন। শুরুতে তাকে মূলত নৃত্যগীত (ড্যান্স নম্বর) যেমন ও হাসিনা জুলফোনওয়ালি ধরনের গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ভাবা হলেও, পরবর্তীতে তিনি দিল চিজ ক্য়া হ্যায়-এর মতো গজল এবং তোরা মন দর্পন কেহলায়ে-এর মতো শাস্ত্রীয় সংগীতেও নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন।

আশা ভোঁসলে পিয়া তু আব তো আজা, কজরা মোহাব্বত ওয়ালা, রঙ্গিলা রে, দিল চিজ ক্য়া হ্যায়- এর মতো অসংখ্য জনপ্রিয় গান দিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন।  এ বছরের ৮ সেপ্টেম্বর তার ৯৩ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল।  তার মৃত্যু বিভিন্ন প্রজন্মের সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। 

প্রথমদিকে ছোট প্রযোজনার ছবিতে গান করলেও ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে তিনি খ্যাতির শিখরে পৌঁছান। ১৯৫৭ সালের ‘নয়া দৌর’ ছবির মাধ্যমে বড় ধরনের সাফল্য পান তিনি।  ১৯৮১ সালের ‘উমরাও জান’ এবং ১৯৮৭ সালের ‘ইজাজত’ চলচ্চিত্রে গানের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন, যা তার গজল ও আধা-শাস্ত্রীয় সংগীতে দক্ষতার স্বীকৃতি দেয়।  পরবর্তী সময়েও ‘রঙ্গীলা’ ও ‘লগান’-এর মতো চলচ্চিত্রে গান গেয়ে তিনি সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ছিলেন।

দীর্ঘ সংগীতজীবনে ২০টিরও বেশি ভাষায় হাজার হাজার গান রেকর্ড করেছেন আশা ভোঁসলে। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার ও পদ্ম বিভূষণ-সহ অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেন। 

সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের ছোট বোন আশা ভোঁসলে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। যদিও তাদের নিয়ে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র গল্প বহু পুরোনো, কেউই কখনও তা সরাসরি স্বীকার করেননি।  

আশা ভোঁসলে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মানুষ অনেক গল্প বানায় এবং সমস্যা তৈরি করার চেষ্টা করে। কিন্তু রক্তের সম্পর্ক পানির চেয়েও শক্তিশালী। মাঝে মাঝে আমরা দু’জনই কোনো অনুষ্ঠানে থাকতাম, তখন ইন্ডাস্ট্রির কিছু লোক আমাকে উপেক্ষা করে শুধু তাকে গুরুত্ব দিত, যেন তারা তাদের আনুগত্য প্রমাণ করছে।  পরে আমি আর দিদি (লতা) এসব নিয়ে হাসাহাসি করতাম।

লতা মঙ্গেশকর এবং আশা ভোঁসলের ছোট বোন হলেন গায়িকা উষা মঙ্গেশকর। মঙ্গেশকর পরিবারে জন্ম হয়েছিল কিংবদন্তি সুরকার পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর এবং শেভন্তী মঙ্গেশকরের ঘরে।  তাদের পাঁচ সন্তান- লতা, মীনা, আশা, উষা এবং হৃদয়নাথ।

আট দশকের দীর্ঘ সংগীতজীবনে আশা ভোঁসলে বহু প্রজন্মের অভিনেত্রীর জন্য গান গেয়েছেন- শর্মিলা ঠাকুর, আশা পারেখ, রেখা, উর্মিলা মাতন্ডকর, কারিশমা কাপুর, ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন থেকে শুরু করে শামিতা শেট্টি পর্যন্ত। ২০২৩ সালে তিনি তাঁর ৯০তম জন্মদিন উদযাপন করেন দুবাইয়ে একটি লাইভ কনসার্ট করে- পারিবারিক শান্ত উদযাপনের বদলে মঞ্চে পারফর্ম করে তিনি আবারও ভক্তদের অবাক করেন।  

তিনি তখন বলেছিলেন, ৯০ বছর বয়সেও মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিন ঘণ্টা গান গাওয়া আমাকে আনন্দ দেয়- আমি এই প্রাণশক্তির জন্য কৃতজ্ঞ। মানুষ তখনই মারা যায় যখন তার শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। আমার কাছে সঙ্গীতই আমার শ্বাস। আমি আমার জীবন এতে উৎসর্গ করেছি এবং কঠিন সময় থেকেও আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছি।

পরের বছর তিনি আবারও ভক্তদের চমকে দেন, দুবাইয়ের কনসার্টে কারান আউজলার ভাইরাল গান তৌবা তৌবা পরিবেশন করে এবং এর বিখ্যাত নৃত্যভঙ্গিমাও নিখুঁতভাবে অনুকরণ করেন।

আশা ভোঁসলে পরিবর্তনশীল সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। তার এক্স অ্যাকাউন্টে ৪.২ মিলিয়ন অনুসারী, ইনস্টাগ্রামে প্রায় ৭,৬০,০০০ অনুসারী এবং ফেসবুকে ৮.৭ লাখের বেশি অনুসারী। তিনি প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান ১৯৮১ সালে উমরাও জান ছবির জন্য এবং দ্বিতীয়টি ১৯৮৮ সালে ইজাজত ছবির জন্য। 

২০০০ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান এবং ২০০৮ সালে পান দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ।  তার শেষ রেকর্ড করা হিন্দি চলচ্চিত্র গান হলো ২০২২ সালের লাইফ’স গুড ছবির রুত ভীঘে তন, যেখানে অভিনয় করেছিলেন জ্যাকি শ্রফ।  

৯১ বছর বয়সে তিনি তার প্রয়াত স্বামী এবং দীর্ঘদিনের সহযোগী সুরকার আর.ডি. বর্মনকে উৎসর্গ করে একটি একক গান সাইয়া বিনা প্রকাশ করেন। গত বছর তিনি তার ব্যক্তিত্ব অধিকার (পারসোনালিটি রাইটস) রক্ষার জন্য বোম্বে হাইকোর্টে যান এবং একটি ঐতিহাসিক রায়ে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা পান।

আশা ভোঁসলের আট দশকের ক্যারিয়ার যেমন অসাধারণ ছিল, তেমনি তার ব্যক্তিগত জীবনেও ছিল উত্থান-পতন।  মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি তার ব্যক্তিগত সচিব গণপতরাও ভোঁসলের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেন।  তাদের তিন সন্তান হয়, তবে এই বিয়ে টেকেনি। প্রথম স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনের কারণে তিনি ১৯৬০ সালে বিচ্ছেদ নেন। 

এর প্রায় ২০ বছর পর তিনি সংগীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ভারতকে এক কিংবদন্তি সংগীত জুটি উপহার দেন। তাদের কোনো সন্তান হয়নি। আশা ভোঁসলে তার তিন সন্তানের মধ্যে দুজনকে হারান। তার কন্যা বর্ষা ২০১২ সালে আত্মহত্যা করেন এবং বড় ছেলে হেমন্ত ২০১৫ সালে ক্যানসারে মারা যান।  তার ছোট ছেলে আনন্দই এখন জীবিত একমাত্র সন্তান।

ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/এসআর


  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
অপূর্বকে নিয়ে সিনেমার গুঞ্জন উড়িয়ে দিলেন রাফী
অপূর্বকে নিয়ে সিনেমার গুঞ্জন উড়িয়ে দিলেন রাফী
আবারও পেছাল সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন
আবারও পেছাল সালমান শাহ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন
পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিষেক নুহাশ হুমায়ূনের
পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিষেক নুহাশ হুমায়ূনের