পঙ্গু হাসপাতালের একক রাজা কেনান, ছবি থাকে মন্ত্রীর ওপরে

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), যা সাধারণের কাছে ‘পঙ্গু হাসপাতাল’ নামে পরিচিত। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বাংলাদেশের প্রধান সরকারি অর্থোপেডিক ও ট্রমা বিষয়ক হাজার শয্যার এই চিকিৎসা কেন্দ্রে দৃষ্টি নেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের।
ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান (কোড নম্বর ৪১৫৩৬) এর একক রাজত্ব চলছে এখানে- যিনি বর্তমানে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে নিটোর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি যে সরকারি আইন পাত্তা দিচ্ছেন না তার প্রমাণ মিলে নিটোর ওয়েবসাইটে। যেখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নিচের সারিতে কেনান’র ছবি থাকার নিয়ম থাকলেও তার ছবি সাটিয়ে রাখা হয়েছে মন্ত্রীর মাথার ওপরে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন অন্য প্রতিষ্ঠান- ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, মিটফোর্ডসহ সরকারি হাসপাতালগুলোর ওয়েবসাইট ঘেটে দেখা গেছে- রাষ্ট্রীয় নিয়ম মেনে পদবি অনুযায়ী ছবিগুলোর বিন্যাস করা হয়েছে স্ব স্ব সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে। আর নিটোর ওয়েবসাইট সাজানো হয়েছে কেনানের নিজস্ব নিয়মে। তিনি ড্যাবের ক্ষমতাধর নেতা হওয়ায় উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেনো চোখই দিচ্ছেন না কেনান নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানটিতে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীসহ স্বাস্থ্যবিভাগের তৎপরতা নিয়েও। সাধারণের সরল প্রশ্ন- ‘মন্ত্রীর মাথার ওপরে কেনান ছবি টানিয়ে রেখেছে সরকারি ওয়েবসাইটে, যে ওয়েবসাইট পৃথিবীর সব মানুষ দেখতে পায়- তাও তো দুই মাসে নজরে আনতে পারলেন না স্বাস্থ্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, স্বাস্থ্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। তাহলে তারা মাঠপর্যায়ে নিয়ম বাস্তবায়ন করবে কিভাবে? নাকি ওসব তাদের বক্তৃতাবাজি?’
কেন এই ব্যত্যয়- জানতে চাইলে ডা. আবুল কেনান ভিওডি বাংলাকে বলেন, ‘সেটা আপনারা বলতেই পারেন। ওয়েবসাইটে কিভাবে কি হলো- তা দেখা হবে।’
তার সঙ্গে কথা হওয়ার পর তিন ঘন্টা নজরদারি করে দেখা গেছে, তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি।
ভিওডি বাংলার ওয়েব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘১০ মিনিটও লাগে না ওয়েবসাইটের এই অনিয়ম বা ভুল ঠিক করতে।’
আরও অভিযোগ রয়েছে এই কেনানের বিরুদ্ধে। নিটোর ইজিপি টেন্ডারে সিন্ডিকেট, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন নামে নির্দিষ্ট গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতের মুঠোয় থাকা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে রহস্যজনকভাবে কাজ দেওয়া হচ্ছে সিন্ডিকেটবাজি করে। এমন কয়েকটি প্রমাণ ভিওডি বাংলার কাছে এসেছে, যেগুলোতে দেখা গেছে- কম দরদাতারা কাজ পাননি, পেয়েছেন সিন্ডিকেটের পছন্দের ঠিকাদাররা। যা ভিওডি বাংলার কাছে অস্বীকার করেছেন কেনান।
শুধু তাই নয়- নিটোর ওয়েবসাইটটিও ভুলে ভরা। এমনকি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন বানানটিও ভুল। ৩৬ জুলাই বা ৫ আগস্টের বদলে লেখা আছে ‘৫ জুলাই’। মোটকথা ভুল শুদ্ধ যা-ই হোক গোটা ওয়েবসাইটজুড়ে কেনানের প্রশংসা, তার অর্জন। মন্ত্রী তো দূরের কথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরও নামগন্ধ নেই নিটোর ওয়েবসাইটে। তিনি স্বাস্থ্যখাতে যে আহ্বান অঙ্গীকার বা কার্যক্রম করছেন- সে বিষয়েও কোনো কিছু বলা নেই এ ওয়েবসাইটে। আছে শুধু সহযোগি অধ্যাপক থেকে বছর ব্যবধানে অধ্যাপক হয়ে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক থেকে পরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া এই কেনানের জয়জয়কার। হঠাৎ তিনি কীভাবে অধ্যাপক হলেন- চিকিৎসক সমাজে প্রশ্ন রয়েছে তা নিয়েও।
এছাড়া সবশেষ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গত ৩১ মার্চ যে প্রজ্ঞাপন জারি করে কেনানকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন, সেখানে স্পষ্ট করা আছে যে- সরকারি বেসরকারি, ব্যবসায়িক বা সাংগঠনিক সকল পদ ছাড়ার শর্তে নিটোর পরিচালক পদে তাকে নিয়োগ দেওয়া হলো। কিন্তু তিনি এখনো বেসরকারি সংগঠন ড্যাবের সিনিয়রসহ-সভাপতি এবং অর্থোপেডিক সোসাইটির আহ্বায়ক- যা তার নিয়োগ বিষয়ক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তবুও তিনি বীরদর্পে খুশিমতো চালিয়ে যাচ্ছেন ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হাড়, জয়েন্ট, ট্রমা এবং পুনর্বাসন সংক্রান্ত বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র ‘নিটোর’।
প্রসঙ্গত, কেনান কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের অর্থোপেডিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পদে কর্মরত ছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর তাকে নিটোর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। এরপর গত ৩১ মার্চ তাকে অধ্যাপক করে নিটোর পরিচালক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। যা নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে নানান অষন্তোষ রয়েছে।
ভিওডি বাংলা/আরআর/আরকেএইচ/আ







