যে কারণে দেশে আরো বাড়তে পারে লোডশেডিং

দেশে পর্যাপ্ত বিদ্যুেকন্দ্র থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে চাহিদামতো বিদ্যুত্ উত্পাদন করা যাচ্ছে না। আগামী দেড়-দুই মাস কম বেশি লোডশেড পরিস্থিতি থাকবে। বরং কখনো কখনো লোডশেডিং বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। বিদ্যুত্ বিভাগের কর্মপরিকল্পনা এবং জ্বালানি বিভাগের আমদানি পরিকল্পনা পর্যালোচনা করে এমন পূর্বাভাস মিলেছে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার বিকাল ৫টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২১৮ মেগাওয়াট, উত্পাদন ও সরবরাহ হয়েছে ১২ হাজার ৮৬৬ মেগাওয়াট, লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৩৫২ মেগাওয়াট।
বিদ্যুত্ বিভাগের এক কর্মকর্তা গতকাল বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) সংবাদ সম্মেলনে জানান, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল আমদানি, কয়লা আমদানি, এমনকি এলএনজি আমদানিতে সংকট রয়েছে। ফলে গ্রীষ্মকালীন কমবেশি লোডশেডিং থাকতে পারে।
জানা গেছে, কয়লাভিত্তিক আটটি বিদ্যুেকন্দ্রের মধ্যে ভারতে আদানি বিদ্যুেকন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ। তবে ২৬ এপ্রিল এটি উত্পাদনে ফিরতে পারে। এছাড়া বাঁশখালীতে এস আলমের এসএস পাওয়ারের একটি ইউনিটে বিদ্যুিবভ্রাটের কারণে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কম আসছে। ২৮ এপ্রিল থেকে এটি পাওয়া যেতে পারে।
আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ১ হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ সরবরাহ বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাম ও শহরের মধ্যে লোডশেডিং সমন্বয় করার নির্দেশনা দিয়েছে বিদ্যুত্ বিভাগ, যাতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। এছাড়া ভারসাম্য বজায় রেখে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুত্ সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পণ্য বিশেষ করে জ্বালানি তেল, কয়লা ও এলএনজি আমদানিতে কিছু সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের সময়ে পুঞ্জীভূত বিপুল বকেয়া, লোকসান ও অর্থ পাচারের কারণে তৈরি হওয়া আর্থিক সংকট পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছে।
কারণ হিসেবে বলছেন, ইরান যুদ্ধের পরে সরকার তার নিয়মিত উত্স থেকে যে জ্বালানি তেল আমদানি করত সেটা বাদ দিয়ে বিকল্প একাধিক উত্স থেকে আমদানি করছে। তবে সেক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্র বা জিটুজি চুক্তির মাধ্যমে আমদানির চেয়ে অনেক বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড গ্রীষ্মে বিদ্যুত্ আমদানির যে পরিকল্পনা করেছে তাতে দেখা যায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুত্ আমদানি ও সরবরাহ করতে হলে সরকারের যে পরিমাণ অর্থ সংস্থান করতে হবে সেখানে নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ফলে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা কেটে ছোট করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যয়বহুল জ্বালানির কারণে তেলভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রগুলো কম চালানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের মূলত লক্ষ্য কিছু গ্যাসভিত্তিক এবং সক্ষমতার পুরোটা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র পরিচালনা করে বিদ্যুত্ সরবরাহ করে যাওয়া।
গতকাল বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুত্ বিভাগের যুগ্মসচিব উম্মে রেহানা জানিয়েছেন, জ্বালানিসংকটে বিদ্যুত্ উত্পাদন কমেছে। বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ চাহিদা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। একই সময়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন হতে পারে। এতে বিদ্যুত্ সরবরাহে ঘাটতি হতে পারে ৩ হাজার মেগাওয়াট। এ ঘাটতি পূরণে লোডশেডিং করার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি জ্বালানির প্রস্তুতিতে ঘাটতি-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা অনেক, কিন্তু গ্যাস ও জ্বালানি স্বল্পতার কারণে উত্পাদন করা যাচ্ছে না। গ্যাস ব্যবহার করে ৫ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদিত হয়েছে বুধবার। যদিও উত্পাদন ক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট; অর্থাত্ গ্যাসের স্বল্পতার কারণে অর্ধেকের কম উত্পাদন করা গেছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। তিনি মানুষকে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান।
এ কর্মকর্তা আরো বলেন, এখানে অনেক টেকনিক্যাল ইস্যু আছে। কারিগরি কারণে অনেক সময় অনেক জায়গায় বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এগুলো আমাদের মেনে নিতে হবে।
বিদ্যুত্ বিভাগ বলছে, গ্যাসচালিত বিদ্যুত্ সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে হলে দিনে ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের দরকার। যদি ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসও সরবরাহ করা হয়, তাহলে ৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করা যেত। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। উত্পাদন খরচ সাশ্রয় করতেই বিদ্যুত্ উত্পাদনে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল কম ব্যবহার করা হয়।
২ হাজার ৬৭ কোটি ৫ লাখ টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ
এদিকে গত ২১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয় বিদ্যুত্ বিভাগের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২ হাজার ৬৭ কোটি ৫ লাখ টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে। ভর্তুকির টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি শুধু বেসরকারি খাতের রেন্টাল ও আইপিপি (ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর জন্য বরাদ্দ দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড বা বিদ্যুত্ বিভাগ আগে নিজেদের মতো করে যে অর্থ পরিশোধ করত সেটা বন্ধ করে দিয়ে বলা হয়েছে এক খাতের বা কেন্দ্রের ভর্তুকি অন্য খাতে স্থানান্তর করা যাবে না।
পিডিবির প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর ১০ মাসে বিদ্যুত্ খাতে উত্পাদন খরচ এবং বিক্রয় মূল্যের মধ্যে যে পার্থক্য, সেই কারণে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির মধ্যে পড়বে। সেই হিসাবও স্থির থাকবে না যদি ডলারের দাম বাড়ে বা জ্বালানি পণ্যের দাম আরো বেড়ে যায়। সেক্ষেত্রে ভর্তুকির হিসাব আরো বাড়বে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ তেল গ্যাস খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা যায়, যুদ্ধের কারণে কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। যার কারণে স্বাভাবিক হিসাবের চেয়ে আগামী তিন মাসে এলএনজি আমদানি করতে অতিরিক্ত খরচ বাড়বে ২০ হাজার কোটি টাকা। যদি এলএনজির দাম আরো বাড়ে সেই খরচ বা ভর্তুকির হিসাব আরো বাড়বে। অর্থাত্ এই যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানি করতে এক গভীর সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুত্ খাতে ভর্তুকি ছিল প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পিডিবি ধারণা করছে, এটা প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হবে। তবে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি বা জ্বালানি পণ্যের দাম আরো বাড়লে ভর্তুকির পরিমাণ আরো বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।
ভিওডি বাংলা/এসআর







