• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ১৩ বছর

এখনো ভবন ধসের ছায়া থেকে বের হতে পারেনি ভুক্তভোগীরা

সোহেল রানা    ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১০:১৪ এ.এম.
তৎকালীন সময়ে রানা প্লাজা ধসের পর লাশ বের করে নিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধার কর্মীরা। ফাইল ছবি

তেরো বছর আগে আজকের এইদিনে ধসে পড়েছিল সাভারের পোশাক কারখানা রানা প্লাজা।  বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় এই শিল্প দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক।  আহত হন আরও প্রায় দুই হাজার শ্রমিক। এ ঘটনায় ওই সময় ৬টি মামলা দায়ের করা হয়।  এরমধ্যে ‘অবহেলার কারণে মৃত্যু’ উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করে পুলিশ; ইমারত নির্মাণ আইন না মেনে ভবন নির্মাণ করায় একটি মামলা করে রাজউক এবং ভবন নির্মাণে দুর্নীতি ও সম্পদের তথ্য গোপন সংক্রান্ত দুটি মামলা করে দুদক। এছাড়া অস্ত্র এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনে দায়ের করা হয় আরও দুটি মামলা।  এখনো শেষ হয়নি এসব মামলার বিচার।  কবে নাগাদ শেষ হবে তাও বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

আর আসামিপক্ষ বলছে, মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিচারহীনভাবে কারাগারে আটক রয়েছেন ভবন মালিক সোহেল রানা।  অন্যদিকে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির আশা করছে রাষ্ট্রপক্ষ।

সেদিনটি ছিল ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল। ভবনটি কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধসে পড়ে ভয়াবহ এক ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়।  ওই ঘটনা শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। একইসঙ্গে দেশের গার্মেন্ট খাতের নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার ব্যবস্থার বড় দুর্বলতাও সামনে আনে।

ঘটনার পর ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ক্ষতিগ্রস্থ ভুক্তভোগীরা আজও পুরোপুরি ক্ষতিপূরণ পাননি। অনেকে কিছু সহায়তা পেলেও তা ছিল মূলত মানবিক সাহায্য, আইনি ক্ষতিপূরণ নয়—এমনটাই বলছেন শ্রম অধিকারকর্মীরা।

দুর্ঘটনার পর দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে বড় অঙ্কের সহায়তা আসে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে প্রায় ১২৭ কোটি টাকা জমা পড়ে, যার একটি অংশ বিতরণ করা হলেও বড় অংশ এখনও স্পষ্টভাবে নিষ্পত্তি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সমন্বয়ে পরিচালিত ‘রানা প্লাজা অ্যারেঞ্জমেন্ট’-এর মাধ্যমে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে ৫ হাজারের বেশি ভুক্তভোগীকে সহায়তা দেওয়া হয়। তবে শ্রমিক নেতাদের মতে, এটি কোনও কাঠামোবদ্ধ ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা ছিল না, ছিল স্বেচ্ছা অনুদান।

শ্রম আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা এবং স্থায়ী অক্ষমতার ক্ষেত্রে আড়াই লাখ টাকা নির্ধারিত। শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে, বাস্তবতার সঙ্গে এটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ হওয়া উচিত ছিল আজীবন আয়ের ভিত্তিতে, যা রানা প্লাজার ক্ষেত্রে প্রতি শ্রমিকের প্রায় ৪৮ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারতো।

ভুক্তভোগীরা এখনও সেই ধসের ছায়া থেকে বের হতে পারেনি। অনেকেই গুরুতর শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন, কেউ আবার কাজ করার সক্ষমতাও হারিয়েছেন। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেকে চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। পরিবার ভেঙে যাওয়া, সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া—এগুলো এখন তাদের নিত্য বাস্তবতা।

শ্রমিক প্রতিনিধিরা বলছেন, শুরু থেকেই তাদের দাবি ছিল শুধু টাকা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মাসিক ভাতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবিও ছিল। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছরেও এসব দাবির বেশিরভাগ বাস্তবায়ন হয়নি।

অপরদিকে, প্রশাসনিক ও বিচারিক প্রক্রিয়াও ধীরগতির। বহু সাক্ষী মারা যাওয়ায় বা নিখোঁজ হওয়ায় মামলার অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে। ফলে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও দোষীদের শাস্তির প্রক্রিয়া এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ সম্ভব নয়।”

শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা শুধু রানা প্লাজা নয়, বরং পুরো কাঠামোর। দেশের বিভিন্ন শিল্প দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমিত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে, যা কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন কাঠামো না থাকায় শ্রমিকরা বারবার বঞ্চিত হচ্ছেন।

এদিকে কিছু উদ্যোগ যেমন কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনা বিমা বা পাইলট সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শুরু হলেও তা এখনও সীমিত পরিসরে রয়েছে এবং বাধ্যতামূলক হয়নি।

রানা প্লাজা হত্যা মামলা

রানা প্লাজা ধসের পরদিন সাভার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ওয়ালী আশরাফ ভবন নির্মাণে ‘অবহেলা ও ত্রুটিজনিত হত্যা’র অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। এ ছাড়া আদালতে একটি হত্যা মামলা করেন গার্মেন্টস শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী শিউলি আক্তার। আদালতের নির্দেশে একে অবহেলাজনিত মৃত্যু মামলার সঙ্গে একীভূত করে তদন্ত করে সিআইডি। 

২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।  মামলায় মোট ৫৯৪ জনকে সাক্ষী করা হয়। ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ এসএম কুদ্দুস জামান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু করেন।

আদালতে দায়ের করা হত্যা মামলার বাদী শিউলি আক্তার এখন পুলিশের করা মামলার সাক্ষী। মামলার ৪১ আসামির মধ্যে ভবন মালিক সোহেল রানার বাবা আব্দুল খালেক, আবু বক্কর সিদ্দিক ও আবুল হোসেন মারা গেছেন।  তিনজনকে বাদ দিয়ে হত্যা মামলায় এখন আসামির সংখ্যা ৩৮।  আসামিদের মধ্যে বর্তমানে কারাগারে আছেন কেবল ভবনের মালিক সোহেল রানা। ২৫ জন আসামি বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন। আর সাভার পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. রেফাত উল্লাহসহ মোট ১২ জন পলাতক রয়েছেন।

বর্তমানে মামলাটি ঢাকার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত-৮ এর বিচারক মুহাম্মদ মুনির হোসাঈনের আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এ মামলায় মোট ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেছেন আদালত। সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ মামলাটিতে ৩ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। আগামী ৩০ এপ্রিল মামলাটির পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য আছে।

ইমারত আইনে রাজউকের মামলা

আইন না মেনে ভবন নির্মাণের অভিযোগে ওই সময় সোহেল রানাসহ ১৩ জনকে আসামি করে সাভার মডেল থানায় আরেকটি মামলা করেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তৎকালীন (রাজউক) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল আহমেদ।  ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর সোহেল রানাসহ ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে ওই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলার সাক্ষী করা হয় ১৩০ জনকে। ২০১৬ সালের ১৪ জুন ঢাকার তৎকালীন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এদের মধ্যে আসামি ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আমিনুল ইসলামকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন আদালত।

আদালত সুত্রে এই মামলা সম্পর্কে জানা গেছে, ২০২৪ সালের বছরের ১৯ নভেম্বর ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের তৎকালীন বিচারক এএইচএম হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া বিচারিক ক্ষমতাবলে হত্যা মামলার পাশাপাশি ইমারত নির্মাণ আইনের মামলাটিও তার অধীনে নেন। যাতে দ্রুত এই দুই মামলার বিচারকার্য শেষ হয়। তবে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে মামলাটি যাওয়ার পরও কোনো তারিখ পড়েনি। 

পরবর্তীতে আবারও মামলাটি ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবর রহমানের আদালতে বিচারাধীন। এই মামলায় সোহেল রানা ছাড়া ১৬ আসামির সবাই জামিনে আছেন। সবশেষ গত ২০ এপ্রিল এই মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। ওইদিন কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। এজন্য আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে।

জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের মামলা 

এই পাঁচ মামলার বাইরে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার বিরুদ্ধে সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে দুদক আরেকটি মামলা দায়ের করেছিল। এই মামলাটি নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০১৫ সালের ১২ এপ্রিল দুদকের সহকারী পরিচালক মাহবুবুল আলম বাদী হয়ে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা ও তার মা মর্জিনা বেগমের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় রানা প্লাজার নির্মাণের তথ্য গোপন করে দুদকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে ছয় কোটি ৬৭ লাখ ৬৬ হাজার ৯০০ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করার অভিযোগ করা হয়। 

২০১৭ সালের ২৯ আগস্ট এ মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬-এর  তৎকালীন বিচারক কে এম ইমরুল কায়েস। রায়ে সোহেল রানাকে তিন বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় তার মা মর্জিনা বেগমকেও তিন বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একইসঙ্গে অবৈধভাবে অর্জিত সাভার বাজার রোডের ৬৯/১ বাড়িটির এক-তৃতীয়াংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেন আদালত।

ভিওডি বাংলা/এসআর

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
বিক্ষোভ জমাতে ঢাকায় লোক এনেছে এস আলম গ্রুপ
বিক্ষোভ জমাতে ঢাকায় লোক এনেছে এস আলম গ্রুপ
১৭ বছরে যা কেউ করতে পারেনি, সেটাই করে দেখালেন আবদুস সালাম
১৭ বছরে যা কেউ করতে পারেনি, সেটাই করে দেখালেন আবদুস সালাম
হরমুজে আড়াই মাস আটকা বাংলাদেশি জাহাজ, কূটনৈতিক চেষ্টায় সরকার
হরমুজে আড়াই মাস আটকা বাংলাদেশি জাহাজ, কূটনৈতিক চেষ্টায় সরকার