১৭ বছরে যা কেউ করতে পারেনি, সেটাই করে দেখালেন আবদুস সালাম

রাজধানীর দক্ষিণাংশ দীর্ঘদিন ধরেই দখল, অব্যবস্থাপনা ও জনদুর্ভোগের এক জটিল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ছিল। গুলিস্তান, সায়েদাবাদ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, ধানমন্ডি, শাহবাগ ও নিউমার্কেট—এই গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ফুটপাত দখল, অবৈধ দোকানপাট এবং বাস কাউন্টারের কারণে পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। প্রতিদিনের যানজট, বিশৃঙ্খলা ও দুর্ভোগ যেন নগরজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল।
গত ১৭ বছরেও এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন মেয়র ও প্রশাসন। মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তা ছিল অনেকাংশেই লোকদেখানো—কিছুদিন পরই আবার পুরোনো অবস্থায় ফিরে যেত সবকিছু। অভিযোগ ছিল, টাকার বিনিময়ে পুনরায় দখল বসানো হতো, ফলে জনদুর্ভোগ থেকে যেত অপরিবর্তিত।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যপটে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম নগর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে শুরু করেন ধারাবাহিক ও কঠোর অভিযান।
ডিএসসিসি ও ডিএমপির নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে গুলিস্তান এলাকা থেকে হকার উচ্ছেদ করে ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের দখলমুক্ত হয়ে সেখানে এখন স্বস্তিতে হাঁটছেন সাধারণ মানুষ।
সাইফুল নামের এক পথচারী বলেন, আগে গুলিস্তান এলাকার ফুটপাত দিয়ে হাঁটা প্রায় অসম্ভব ছিল। হকার আর দোকানপাটে ভরে থাকায় রাস্তায় নামতে হতো, এতে সবসময় ভয় আর ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হতো। এখন ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় অনেক স্বস্তিতে চলাফেরা করতে পারছি। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে বের হলে আগের মতো দুশ্চিন্তা থাকে না। আশা করি, এই শৃঙ্খলাটা দীর্ঘদিন ধরে রাখা হবে।
আজাদ নামের এক স্থানীয় পথচারী জানান, গুলিস্তান আগে তো অবস্থা আছিল একদম খারাপ—ফুটপাত মানে হকারের দখল, মানুষ চলার জায়গা নাই। আমাগো রাস্তায় নামতে হইত, গাড়ির ভয় থাকত সবসময়। এখন অনেকটাই পরিবর্তন হইছে, ফাঁকা ফাঁকা লাগে, আরামে যাইতে পারি। সত্যি কথা কইলে, এইটা দেইখা ভালোই লাগতেছে। যদি এই নিয়মটা ধরে রাখা যায়, তাইলে সবার জন্যই ভালো হইবো।
অন্যদিকে রাজধানীজুড়ে, বিশেষ করে গুলিস্তান এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় বাসচালক ও যাত্রীদের মাঝেও স্বস্তি ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিনের যানজট ও বিশৃঙ্খলা কমে আসায় তারা এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
বিশেষ করে হানিফ ফ্লাইওভার ব্যবহারকারী বাসচালক ও যাত্রীরা এই পরিবর্তনকে ভিন্ন ভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন।
রজনীগন্ধা বাসের চালক রবিউল জানান, আগে গুলিস্তান সাইডে গাড়ি চালানো মানেই আছিল ঝামেলা। হকার আর অবৈধ দোকানপাটে রাস্তা দখল কইরা রাখত, বাস ঢুকানোর জায়গা পাইতাম না ঠিকমতো। যাত্রাবাড়ী পকেট গেট থেইকা গুলিস্তান যাইতে ফ্লাইওভারের উপরেই এক-দেড় ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকতে হইত। গাড়ির অনেক তেল খরচ হতো, যাত্রীদেরও অনেক সময় নষ্ট হতো। এখন রাস্তা ক্লিয়ার, রায়েরবাগ বা সাইনবোর্ড থেইকা ২০-৩০ মিনিটেই পৌঁছাইয়া যাই। এইটা আমাদের জন্য অনেক বড় সুবিধা হইছে।
একই বাসে সাইনবোর্ড থেকে আসা যাত্রী রুবেল বলেন, “আগের পরিস্থিতি ছিল সত্যিই কষ্টকর। গুলিস্তান এলাকায় নামলেই মনে হতো বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঢুকে পড়েছি। যাত্রাবাড়ী থেকে আসতে ফ্লাইওভারে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হতো। এখন সেই অবস্থা অনেকটাই বদলে গেছে। রায়েরবাগ, সোনিরাখরা বা সাইনবোর্ড থেকে ২০-৩০ মিনিটে চলে আসা যায়। সময় বাঁচছে, যাতায়াত অনেক সহজ হয়েছে—এটা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে।”
সায়েদাবাদ এলাকায় অবৈধ দোকানপাট ও বাস কাউন্টার উচ্ছেদ করায় যানজট অনেকাংশে কমেছে। আগে যেখানে প্রতিনিয়ত যানবাহনের চাপ ও বিশৃঙ্খলা ছিল নিত্যদিনের চিত্র, এখন সেখানে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে।
অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ফুটপাত দখলমুক্ত করায় রোগী ও তাদের স্বজনদের চলাচলে এসেছে স্বস্তি। জরুরি মুহূর্তে দ্রুত যাতায়াতের সুবিধা নিশ্চিত হওয়ায় জনসাধারণের ভোগান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এছাড়াও রোগীদের মানসিকভাবে স্বস্তি ও ইতিবাচক পরিবেশ দিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের দেয়ালজুড়ে দৃষ্টিনন্দন পেইন্টিং করা হয়েছে। আশপাশের এলাকাও বিভিন্ন রঙিন ফুল ও টব দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে, যা পুরো পরিবেশে এক ধরনের প্রশান্তি এনে দিয়েছে। গত ১৫ এপ্রিল এই সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম।
হকারদের জীবনসংকট
এদিকে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের মধ্যে অনেকে অভিযোগ করে বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে যেখান থেকে তারা জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন, সেখান থেকে হঠাৎ করে সরিয়ে দেওয়ায় তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। তাদের ভাষায়, নির্দিষ্ট কোনো বিকল্প জায়গা বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকায় এখন তারা দিশেহারা।
আলামিন নামে এক হকার বলেন, “আমাদের একমাত্র রোজগারের জায়গা থেকেই উচ্ছেদ করে দেওয়া হয়েছে। এখন আমরা কীভাবে চলবো, পরিবার কীভাবে চালাবো? আমাদের তো আর কোনো আয় নেই—আমরা খাবো কীভাবে?”
প্রশাসকের মানবিক উদ্যোগ
এদিকে হকার উচ্ছেদে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনায় নিয়েছেন ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম। তিনি শুধু উচ্ছেদ অভিযানেই সীমাবদ্ধ না থেকে হকারদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের বিষয়েও কাজ শুরু করেছেন।
তিনি বলেছেন, রাজধানীর ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে ব্যবসায়ীদের তালিকাভুক্ত করে লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ফুটপাত যেন পথচারীদের জন্য অনুপযোগী হয়ে না পড়ে, সেজন্য নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স দেওয়া হবে। যেকোনো ধরনের ব্যবসার মতো ফুটপাতেও ব্যবসা করতে হলে সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে জনগণ ও সিটি করপোরেশনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ‘ফিফটি-ফিফটি’ অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই উদ্যোগ কেবল উচ্ছেদ অভিযানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি নগর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। নিয়মিত মনিটরিং এবং প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে পুনরায় দখলদারদের ফিরে আসার সুযোগ কমে গেছে।
প্রশাসনের এই সক্রিয় ভূমিকার ফলে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ধীরে ধীরে ফিরছে স্বাভাবিকতা। নগরবাসীর একাংশ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, “অনেক বছর পর ঢাকায় হাঁটার মতো ফুটপাত ফিরে পেয়েছি। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে শহরের চেহারা আরও বদলে যাবে।”
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে হকারদের জন্য বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে পুনরায় দখলের ঝুঁকি থেকেই যাবে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভেঙে রাজধানীতে শৃঙ্খলা ফেরানোর এই উদ্যোগ নগর ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়—এই ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা কতটা ধরে রাখা যায় এবং তা ভবিষ্যতে কতদূর বিস্তৃত হয়।
ভিওডি বাংলা/খতিব/এমএস







