এনসিপির ছায়া বাজেটে ৭১ নীতিগত প্রস্তাব

সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ছায়া বাজেট ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ১২টি প্রধান খাতে বিভক্ত এই বাজেটে মোট ৭১টি নীতিগত প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
শুক্রবার (৫ জুন) বিকেল সাড়ে ৩টায় রূপায়ণ টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ছায়া বাজেট কমিটি এসব প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ, ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ও সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদ, উপ-প্রধান আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল, যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ এবং জাতীয় শ্রমিক শক্তির যুগ্ম আহ্বায়ক সজিব ওয়াহিদ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য দেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। পরে ছায়া বাজেটের বিস্তারিত ৭১টি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন ড. আতিক মুজাহিদ ও আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল। প্রস্তাবগুলোতে রাজস্ব ও সামষ্টিক অর্থনীতি, কর কাঠামো সংস্কার, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জ্বালানি, নারী-যুব অন্তর্ভুক্তি, শাসন সংস্কার, অর্থায়ন, প্রতিরক্ষা এবং স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সামষ্টিক অর্থনীতি ও রাজস্ব পরিকল্পনা
প্রস্তাবে বলা হয়, সামাজিক খাতে ব্যয় বাড়িয়েও সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা হবে। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩.০৯ শতাংশে সীমিত রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। মোট বাজেট ধরা হয়েছে ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭.৮৭ শতাংশ বা ৬২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা বেশি। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ২৬০ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৯.২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৭–২৮ অর্থবছরে তা ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৯.৩২ শতাংশে পৌঁছানো, সুদ ব্যয় ১৫.৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৩ শতাংশে নামানো এবং ব্যাংকিং খাতে সরকারি ঋণ ১৪ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
কর ও রাজস্ব সংস্কার
রাজস্ব সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ছয়টি লিভারের মাধ্যমে ৭৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আয়, নির্দিষ্ট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা, টিআইএন-এনআইডি-এমএফএস সংযোগ, জাতীয় ডিজিটাল সম্পদ নিবন্ধন চালু, বন্দরের ডিজিটালাইজেশন, অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি বাতিল এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির প্রস্তাব রাখা হয়।
কর কাঠামো সংস্কারের মধ্যে রয়েছে সাধারণ করমুক্ত সীমা ৪.৫ লাখ টাকা, নারী ও প্রবীণদের জন্য ৪.৭৫ লাখ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ। জাকাতকে কর রিবেট হিসেবে অন্তর্ভুক্তি, উত্তরাধিকার কর চালু, করপোরেট কর ২৫ শতাংশে নামানো, ভ্যাট লটারি চালু এবং ৮টি নিত্যপণ্য পাঁচ বছর ভ্যাটমুক্ত রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা
শিক্ষা খাতে ১ লাখ ২৪ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ, শতভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং, ৫ হাজার কোটি টাকার শিক্ষক গুণমান তহবিল, বেসরকারি স্কুল জাতীয়করণ, কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি ৩০ শতাংশে উন্নীতকরণ, স্টার্টআপ গ্যারান্টি ফান্ড এবং ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে জাতীয় স্বাস্থ্য বিমা চালু, স্বাস্থ্য বাজেট ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি, জটিল রোগে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি, দুইটি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, ৫০০ আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স, টিসিবি কার্ড আধুনিকায়ন, প্রতিবন্ধী ভাতা তিনগুণ বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি একীভূত করার প্রস্তাব রয়েছে।
কৃষি, জ্বালানি ও পরিবেশ
কৃষিতে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে ভর্তুকি, খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং ব্লু ইকোনমির জন্য ৫০০ কোটি টাকার উদ্যোগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি খাতে সৌর পণ্যে পাঁচ বছরের জন্য শূন্য কর, ৬ হাজার কোটি টাকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্মসূচি, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে কর ছাড় এবং ২০ লাখ ই-রিকশা লিথিয়াম ব্যাটারিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
নারী ও অন্তর্ভুক্তি
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল, সম্পূর্ণ জামানতবিহীন ঋণ, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন বেতনভুক্ত ছুটি, স্যানিটারি ন্যাপকিনে কর প্রত্যাহার এবং ধর্মীয় পেশাজীবীদের জাতীয় বেতন কাঠামোয় অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবও ছায়া বাজেটে স্থান পেয়েছে।
ভিওডি বাংলা/এমএস







