ইসরাইলের ৬০ বছরের ‘বিশেষ সুবিধা’ ভেঙে দিচ্ছেন ট্রাম্প!

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য মিত্র ইসরাইল। যুদ্ধ, কূটনীতি কিংবা আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রতিটি ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান অংশীদার দেশটি।
বিশেষ করে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের সময়ও মার্কিন সমর্থন ছিল প্রায় প্রশ্নাতীত। তবে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কয়েকটি পদক্ষেপ নতুন করে আলোচনায় এনেছে একটি পুরোনো কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিকে ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ (কিউএমই) বা ইসরাইলের গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব।
দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করে এসেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় ইসরাইল প্রযুক্তি, অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতায় এগিয়ে থাকবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সৌদি আরবের কাছে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির ঘোষণার পর প্রশ্ন উঠেছে ওয়াশিংটনের এই দীর্ঘদিনের নীতিতে কি পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে?
কম জনসংখ্যা, শীর্ষ সামরিক সক্ষমতা
বর্তমানে প্রায় ১ কোটি জনসংখ্যার ইসরাইল চারদিকে জনবহুল আরব রাষ্ট্র দ্বারা পরিবেষ্টিত। এই বাস্তবতায় কিউএমই নীতির মূল লক্ষ্য হলো সংখ্যাগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী যেন প্রযুক্তি ও সক্ষমতার বিচারে অঞ্চলের যেকোনো দেশ বা সম্ভাব্য জোটের চেয়ে সবসময় এগিয়ে থাকে।
এই নীতি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র শুধু বিপুল পরিমাণ সামরিক সহায়তাই দেয়নি বরং এমন বহু উন্নত অস্ত্র ও প্রযুক্তি ইসরাইলকে সরবরাহ করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই অপ্রাপ্য ছিল।
স্নায়ুযুদ্ধ থেকে আইনে রূপান্তর
কিউএমই নীতির শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের মধ্যে। স্নায়ুযুদ্ধের উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে ১৯৬৮ সালে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন ইসরাইলের কাছে ৫০টি এফ-৪ ফ্যান্টম যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদন দেন যা দুই দেশের সামরিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায় তৈরি করে।
পরবর্তীতে আশির দশকে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানের প্রশাসন প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে
‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ শব্দটি ব্যবহার করে।
নব্বইয়ের দশকে সৌদি আরবকে এফ-১৫এস যুদ্ধবিমান বিক্রি করা হলেও ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে বিমানগুলোর কিছু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সীমিত রাখা হয়েছিল।
২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে ‘নেভাল ভেসেল ট্রান্সফার অ্যাক্ট’ এর মাধ্যমে কিউএমই নীতি মার্কিন আইনে রূপ পায়। এরপর ২০১৩ সালে বারাক ওবামা প্রশাসন আইনটিকে আরও শক্তিশালী করে। এর ফলে প্রতি দুই বছর অন্তর কংগ্রেসে ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব মূল্যায়নের বাধ্যতামূলক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিধান চালু হয়।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক সহায়তা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে ২৪০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সামরিক সহায়তা দিয়েছে। ২০১৬ সালে ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় ২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর অন্তত ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তার নিশ্চয়তা রয়েছে।
তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তী গাজা যুদ্ধের পর এই সহায়তা আরও বৃদ্ধি পায়। মার্কিন কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইসরাইলের জন্য বার্ষিক সামরিক সহায়তা রেকর্ড ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
এফ-৩৫: ইসরাইলের শক্তির প্রতীক
বর্তমান সময়ে কিউএমই নীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিফলন হলো এফ-৩৫ স্টিলথ যুদ্ধবিমান।যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিন নির্মিত এই পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানকে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও কার্যকর ফাইটার জেট হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০১০ সালে ইসরাইল প্রথম দেশ হিসেবে এফ-৩৫ কেনার চুক্তি করে। পরবর্তীতে নিজেদের প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে এর বিশেষ সংস্করণ ‘এফ-৩৫আই আদির’ তৈরি করে, যা সম্পূর্ণভাবে ইসরাইলি প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযোজিত।
২০১৮ সালে লেবাননে অভিযান চালিয়ে ইসরাইলই প্রথম কোনো দেশ হিসেবে বাস্তব যুদ্ধে এফ-৩৫ ব্যবহার করে। এরপর ইরান, সিরিয়া, ইয়েমেন ও গাজাসহ বিভিন্ন অভিযানে এই বিমান ব্যবহৃত হয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে ইরান-ইসরাইল সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে এফ-৩৫-এ অতিরিক্ত জ্বালানি ট্যাংক যুক্ত করার অনুমতি দেয়। এর ফলে মার্কিন ঘাঁটির ওপর নির্ভর না করেই ইসরাইল থেকে সরাসরি ইরানে অভিযান চালানো সম্ভব হয়।
যুদ্ধবিমান থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা: মার্কিন প্রযুক্তির ছায়া
ইসরাইলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার আরেকটি বড় ভিত্তি হলো মার্কিন অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় গড়ে ওঠা আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক। আয়রন ডোম, ডেভিডস স্লিং এবং অ্যারো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশটিকে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা দিয়েছে।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলের অঘোষিত অবস্থানকেও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে কার্যত রাজনৈতিক সুরক্ষা দিয়ে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই বাড়ছে প্রশ্ন
গাজা যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ইসরাইলকে দেওয়া সামরিক সহায়তা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দুই শিবিরেরই একটি অংশ এই সহায়তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালাইব গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে মার্কিন সহায়তা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান মার্জোরি টেলর গ্রিন আয়রন ডোমের জন্য বরাদ্দ অর্থ কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যদিও তা শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পায়নি।
রক্ষণশীল মহলেও এই বিতর্ক পৌঁছে গেছে। বিশ্লেষক টাকার কার্লসনের মতো প্রভাবশালী কণ্ঠও প্রকাশ্যে ইসরাইলকে দেওয়া মার্কিন সহায়তা বন্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
সৌদি চুক্তিতে কিউএমই বিতর্ক
সম্প্রতি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওয়াশিংটন সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির ঘোষণা দেন। এই সিদ্ধান্তকে অনেক বিশ্লেষক কিউএমই নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখছেন।
কারণ মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশের হাতে এফ-৩৫ পৌঁছে গেলে ইসরাইলের দীর্ঘদিনের একচেটিয়া প্রযুক্তিগত সুবিধা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
তবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দাবি, মার্কিন প্রশাসন তাকে আশ্বস্ত করেছে যে ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া হবে না।তাছাড়া সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির প্রস্তাব এখনও কংগ্রেসের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
নীতি বদল নাকি কৌশলগত সমন্বয়?
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা জোট গড়ে তোলার অংশ হিসেবে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর করতে চাইছে। কিন্তু তাই বলে ইসরাইলের কিউএমই নীতি পুরোপুরি পরিত্যাগ করার সম্ভাবনা এখনো খুবই কম।
বরং বাস্তবতা হলো, ইসরাইল ইতোমধ্যেই আরও ২৫টি এফ-৩৫ এবং নতুন প্রজন্মের এফ-১৫আইএ যুদ্ধবিমানের অর্ডার দিয়েছে। এসব বিমান সরবরাহ সম্পন্ন হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক যুদ্ধবিমান বহর থাকবে দেশটির হাতে।
নতুন মধ্যপ্রাচ্য সমীকরণ
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল ইসরাইলের গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করা। ট্রাম্পের সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়ার উদ্যোগ সেই নীতিকে ঘিরে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করলেও এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের মূল অবস্থান বদলে যাওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা করছেন, এই অবস্থান অতি শীঘ্রই বদলে যাবে।
প্রশ্নটি এখন আর শুধু ইসরাইলকে এগিয়ে রাখার নয় বরং দ্রুত পরিবর্তিত মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে একদিকে ইসরাইলের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখে অন্যদিকে নতুন আঞ্চলিক অংশীদার দেশগুলোকে শক্তিশালী করবে সেই সমীকরণই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে যাচ্ছে।
ভিওডি বাংলা/এমএস







