• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১

হামে প্রতিদিন ছয় শিশুর প্রাণহানি, আতঙ্ক বাড়ছে অভিভাবকদের

রেজাউল করীম হীরা    ৫ মে ২০২৬, ০৯:১৯ এ.এম.
প্রতীকী ছবি

দেশে হামের প্রকোপ ক্রমেই উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারি নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এ রোগের বিস্তার ও মৃত্যুহার বাড়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে অভিভাবকদের মধ্যে।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশে প্রথম হাম শনাক্ত হওয়ার পর গত প্রায় ৫০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ একদিনেই ১৭ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৩১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ছয়জন শিশুর প্রাণহানির এই চিত্র জনস্বাস্থ্যের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আগাম প্রস্তুতির অভাব এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে দেরির কারণে পরিস্থিতি এতটা জটিল হয়ে উঠেছে। যদিও সরকারিভাবে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে, হাসপাতালগুলোতে হামের চিকিৎসার জন্য আলাদা ইউনিট খোলা হয়েছে এবং শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—তবুও বাস্তবে রোগ নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসছে না।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা না থাকায় বাড়ছে ভোগান্তি। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো নিবিড় পরিচর্যা না পাওয়ায় রোগীর অবস্থা জটিল হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চিকিৎসা ব্যবস্থার যথাযথ বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়া এবং টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতি এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন, চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকায় আক্রান্তের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মৃত্যুও বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হলো টিকাদান কর্মসূচির শতভাগ সফল বাস্তবায়ন। লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলেও সংক্রমণ কমতে আরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। আক্রান্তের সংখ্যা কমে এলে মৃত্যুহারও স্বাভাবিকভাবে কমে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এদিকে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সরকার যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে তার সুফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে। ইতোমধ্যে যারা আক্রান্ত হয়েছে, তাদের একটি বড় অংশ গুরুতর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা আগামী কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, বর্তমানে যে মৃত্যুগুলো ঘটছে, সেগুলো সাম্প্রতিক সংক্রমণের ফল নয়; বরং এক থেকে দেড় মাস আগে সংক্রমিত রোগীদের মধ্যেই মৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটছে। ফলে সংক্রমণ কমে গেলেও মৃত্যুহার কমতে সময় লাগবে।

বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণার ওপর গুরুত্বারোপ করে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, গুরুতর রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে জরুরি। প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ সুবিধার একটি অংশ হামের শিশু রোগীদের জন্য বরাদ্দ করা যেতে পারে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলে সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো সহজ হবে বলেও তিনি মনে করেন।

তিনি আরও বলেন, যেসব এলাকায় ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে, সেখানে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে নতুন নতুন এলাকায় রোগ ছড়িয়ে পড়ায় সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হতে পারে চলতি মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সরকার জানিয়েছে, দেশের ৯৫ শতাংশ শিশুকে হামের টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে প্রায় ৮১ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে এবং খুব শিগগিরই শতভাগ কভারেজ অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, টিকা প্রয়োগের পর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে। তাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ফল পেতে ধৈর্য ধরতে হবে। টিকাদান কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসকদেরও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পূর্বে আশা প্রকাশ করেছিল, মে মাসের মধ্যেই হামের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কার্যকর সমন্বয়, দ্রুত টিকাদান এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

সার্বিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় হামের এই প্রাদুর্ভাব আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভিওডি বাংলা/আরকেএইচ/এফএ

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে সুইডেনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ
সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে সুইডেনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপদেষ্টা চীন সফরে যাচ্ছেন মঙ্গলবার
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপদেষ্টা চীন সফরে যাচ্ছেন মঙ্গলবার
সিরডাপের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পল্লী উন্নয়নে নতুন গতি আসবে : এলজিআরডি মন্ত্রী
সিরডাপের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পল্লী উন্নয়নে নতুন গতি আসবে : এলজিআরডি মন্ত্রী