পদ্মা ব্যারেজে বদলে যেতে পারে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি

শুষ্ক মৌসুমে রাজশাহী ও এর আশপাশের অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে পানির সংকট একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের একটি বড় সময় বৃষ্টির অভাবে কৃষিজমিতে সেচ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে হাজার হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি থেকে যায় বা কম উৎপাদন হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের আয় ও জাতীয় খাদ্য উৎপাদনে।
এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট সমাধানে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
বর্তমানে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষির বড় অংশই নির্ভর করছে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। ডিপ টিউবওয়েল ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচ দিতে গিয়ে পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, পদ্মা ব্যারেজ নির্মিত হলে বর্ষাকালে পদ্মার বিপুল পানি সংরক্ষণ করা যাবে। এই সংরক্ষিত পানি শুষ্ক মৌসুমে সেচ ব্যবস্থায় ব্যবহার করা সম্ভব হবে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ অনেকটাই কমে আসবে।
তাদের মতে, এটি শুধু কৃষি নয়, পুরো অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পদ্মা ও এর শাখা নদীগুলোর নাব্যতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। দীর্ঘদিন ধরে অনেক নদী শুকিয়ে যাওয়া বা প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পদ্মা ব্যারেজ চালু হলে সংরক্ষিত পানি বিভিন্ন নদী-প্রণালীতে প্রবাহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে গড়াই, বড়াল, চন্দনা, বারাশিয়া, ইছামতি ও অন্যান্য নদীগুলোতে পানির প্রবাহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, পানির অভাবে অনেক সময় ধানসহ প্রধান ফসল চাষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকতে হলেও লাভ কমে যায়।
গোদাগাড়ী ও বাঘা অঞ্চলের কয়েকজন কৃষকের মতে, পদ্মায় যদি সারা বছর পানি ধরে রাখা সম্ভব হয়, তাহলে সেচ সংকট অনেকটাই কমে যাবে। তারা মনে করেন, এতে করে বিশেষ করে চরাঞ্চলের কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।
একজন কৃষক জানান, শীতকাল থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত সময়টি সবচেয়ে কঠিন থাকে, যখন পানির অভাবে জমি শুকিয়ে যায়। এই সময় পর্যাপ্ত পানি পাওয়া গেলে উৎপাদন অনেক বাড়বে।
নদী গবেষক ও পরিবেশবিদদের মতে, পদ্মা ব্যারেজ শুধু একটি সেচ প্রকল্প নয়, বরং এটি একটি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে।
তাদের মতে, ব্যারেজের মাধ্যমে পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে ধাপে ধাপে বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা গেলে নদীগুলোতে প্রাণ ফিরবে। এতে শুধু কৃষি নয়, মৎস্য সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যও উপকৃত হবে।
এছাড়া কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও এটি সহায়ক হতে পারে।
প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনাও রাখা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গড়াই অফ-টেক স্ট্রাকচারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রায় শতাধিক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতে পারে।
এছাড়া ব্যারেজে পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কুলিং ব্যবস্থার জন্যও নিরবচ্ছিন্ন পানির যোগান নিশ্চিত করা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকারি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পদ্মা ব্যারেজের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। শুষ্ক মৌসুমে প্রায় কয়েক হাজার মিলিয়ন ঘনমিটার পানি ধরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই পানি সেচ ছাড়াও নদী পুনরুজ্জীবন, শিল্প-কারখানা, এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ব্যবহার করা হবে।
একই সঙ্গে গড়াই ও বড়াল নদ পুনঃখননের মাধ্যমে প্রায় শত শত কিলোমিটার নদীপথ সচল করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসবে।
নতুন সেচ সুবিধার কারণে ফসল উৎপাদন বাড়বে, কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
এছাড়া নদীপথ সচল হলে যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থায়ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
ভিওডি বাংলা/রমজান আলী/জা







