• ঢাকা বুধবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ৩ পৌষ ১৪৩১
  • live

নদ-নদীর মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি

খুলনা ব্যুরো    ১৭ মে ২০২৬, ১১:৪৯ এ.এম.
নদীতে ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে তৈরি হচ্ছে ক্ষুদ্র কণা, যা মাছের শরীরে প্রবেশ করে পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের খাদ্যচক্রে। ছবি : সংগৃহীত

প্লাস্টিক দূষণ এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং এটি সরাসরি মানবস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত এক ভয়াবহ সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। নদ-নদী, খাল-বিল এবং সমুদ্রের মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার উপস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এসব ক্ষুদ্র কণা মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে নানা জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভৈরব ও রূপসা নদীকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, নদীর তলদেশে শুধু প্লাস্টিকই নয়, এর সঙ্গে মিশে আছে বিপজ্জনক ভারী ধাতুও। এতে নদীর জীববৈচিত্র্য যেমন হুমকির মুখে পড়ছে, তেমনি সুন্দরবনসহ উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, ভৈরব ও রূপসা নদীর তলদেশ এখন ধীরে ধীরে দূষণের একটি “সংরক্ষণাগারে” পরিণত হচ্ছে। নদীর ১০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার গভীর পলিতে পাওয়া যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা, যার সঙ্গে মিশে আছে ক্যাডমিয়াম, সিসা, নিকেল ও ক্রোমিয়ামের মতো বিষাক্ত ভারী ধাতু।

এই দূষণ কেবল পানির উপরের স্তরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং নদীর গভীর স্তরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে নদীর বাস্তুতন্ত্র পুরোপুরি বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক তথ্য। আন্তর্জাতিক জার্নালেও প্রকাশিত ওই গবেষণায় দেখা যায়-
প্রতি কেজি নদী পলিতে হাজার হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে, গড় হিসেবে এই সংখ্যা কয়েক হাজার পর্যন্ত পৌঁছায়, সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে ফ্র্যাগমেন্ট, ফাইবার ও ফিল্ম ধরনের প্লাস্টিক কণা, পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন ও পলিস্টাইরিনের মতো সাধারণ প্লাস্টিকই বেশি ভেঙে এসব কণা তৈরি করছে।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, নদীর নিচের স্তরেও একইভাবে প্লাস্টিক জমে আছে, যা দীর্ঘমেয়াদে নদীর প্রাকৃতিক পুনর্জীবন ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

গবেষকদের মতে, এই দূষণের মূল কারণ হলো অপরিকল্পিত নগর ও শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। খুলনা ও যশোর অঞ্চলের বিভিন্ন খাল ও ড্রেনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রচুর বর্জ্য সরাসরি নদীতে মিশে যাচ্ছে।

শহরের গৃহস্থালি বর্জ্য, প্লাস্টিক প্যাকেট, খাদ্য আবর্জনা এবং শিল্পকারখানার কেমিক্যাল মিশে নদীর পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে। বিশেষ করে নওয়াপাড়া শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোর বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নদীর মাছ এখন এই দূষণের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। মাছ খাদ্যের সঙ্গে এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে, যা পরে তাদের শরীরে জমা হচ্ছে।

এই মাছ যখন মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন সেই মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে। গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে-হজম ও অন্ত্রের সমস্যা দেখা দিতে পারে, শরীরে বিষাক্ত ধাতু জমতে পারে, ক্যানসারসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

ভৈরব ও রূপসা নদীর পানি সরাসরি সুন্দরবনের সঙ্গে যুক্ত। ফলে জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে এই দূষিত পানি ও পলি সুন্দরবনের গভীরে প্রবেশ করছে।

সুন্দরবন সংলগ্ন নদীগুলোতেও প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। বাজার, বসতি ও পর্যটন এলাকাগুলো থেকে ফেলা প্লাস্টিক জোয়ারের পানিতে ভেসে বনের ভেতরে ঢুকে পড়ছে।

এতে ম্যানগ্রোভ বন, জলজ প্রাণী এবং পুরো বাস্তুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, নদীর তলদেশে জমে থাকা ভারী ধাতু ও মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন “উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ স্তরে” পৌঁছে গেছে। এই দূষণ ধীরে ধীরে-
মাছের প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে,  জলজ প্রাণীর সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে ও সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই নদীগুলো তাদের প্রাকৃতিক অস্তিত্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক-রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে, ফুসফুসে জমা হতে পারে, লিভার ও কিডনির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে ও দীর্ঘমেয়াদে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

এটি বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ তারা সরাসরি নদী ও সমুদ্রের মাছের ওপর নির্ভরশীল।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় অনিবার্য।
তাদের মতে প্রয়োজন- আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিল্প বর্জ্য শোধন বাধ্যতামূলক করা , নদীতে সরাসরি বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি।

একজন গবেষক জানান, নদীর বর্তমান অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সঠিক উদ্যোগ ছাড়া এটি পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করণীয় নির্দেশ করেছেন-প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়িয়ে চলা, নদী ও খালে বর্জ্য না ফেলা, মাছ ভালোভাবে পরিষ্কার করে রান্না করা ও স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা

বড় মাছের চেয়ে তুলনামূলক ছোট মাছ খাওয়া ভালো। এ ছাড়া সামুদ্রিক ও নদীর দূষিত এলাকার মাছের চেয়ে চাষ করা (ফার্মের) মাছ বা গভীর জলের মাছ খাওয়া অপেক্ষাকৃত নিরাপদ।

মাছ খাওয়ার সময় কাঁটার পাশাপাশি পেটের দিকের অংশ বা চামড়া এড়িয়ে চলতে পারেন, কারণ অনেক সময় চামড়ার নিচেও ক্ষতিকর কণা জমে থাকতে পারে। তবে মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। সচেতনতা ও সঠিক প্রক্রিয়ায় মাছ প্রস্তুত করার মাধ্যমে এর ক্ষতিকর প্রভাব অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

ভিওডি বাংলা/জা

  • দেশজুড়ে এর পাঠক প্রিয়
আরও পড়ুন
লুঙ্গি-গেঞ্জি গামছা মাথায় হেলমেট পরে ক্লাসে শিক্ষার্থীরা
লুঙ্গি-গেঞ্জি গামছা মাথায় হেলমেট পরে ক্লাসে শিক্ষার্থীরা
জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে : প্রতিমন্ত্রী অমিত
জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে : প্রতিমন্ত্রী অমিত
যশোর যুবলীগ সভাপতি মোস্তফা ফরিদ আটক
যশোর যুবলীগ সভাপতি মোস্তফা ফরিদ আটক