‘গোপনে’ কারামুক্ত কাইল্যা পলাশ, হতে চান কাউন্সিলর!

ইয়াসিন খান ওরফে পলাশ। অপরাধ জগতে তার নাম কালা পলাশ বা কাইল্যা পলাশ। কারাবন্দি অবস্থায় সন্তান জন্ম দেয়াসহ মুঠোফোনে চাঁদাবাজি, খুন, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসীদল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বহুবার আলোচনায় আসা এই শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম শুনলেই আতকে ওঠেন ঢাকার রামপুরা ও আশপাশ এলাকার মানুষ।
দীর্ঘ ২২ বছর ধরে কারাগারে থাকা যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এ শীর্ষ সন্ত্রাসী সম্প্রতি কারামুক্ত হয়েছেন। বিষয়টি এতটা নীরবে ঘটেছে যে- কারাগার ও আদালত পাড়ায় কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীরাও টের পাননি। খবর বেরোয়নি সামাজিক যোগাযোগ বা গণমাধ্যমে।
জানতে চাইলে কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত-উল ফরহাদ ভিওডি বাংলাকে নিশ্চিত করেন, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহের শেষের দিকে কারামুক্ত হয়েছেন পলাশ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নীতি অনুযায়ী বৈধ নজরদারি করে ভিওডি বাংলা নিশ্চিত হয়েছে যে, গত ১০ মে থেকে ঢাকার রামপুরা এলাকার বাসায় দেখা যাচ্ছে পলাশকে। সেখানে তার সঙ্গে অনুগত, সহযোগী ও পরিচিতজনরা সাক্ষাত করছেন। তবে কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ হয়নি ছবি।
গোয়েন্দা নথিতে পলাশের বিরুদ্ধে এমনও অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি হাতকড়া পরা অবস্থায় এলাকায় এসে গুলি চালিয়েছেন।
পলাশের সঙ্গে যারা সাক্ষাত করেছেন- তাদের অন্তত ৫ জনের সঙ্গে কথা বলেছে ভিওডি বাংলা। তারা জানিয়েছেন, পলাশ জামিন পেয়েছেন। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে রামপুরা এলাকা থেকে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। লম্বা দাড়ি রেখেছেন। বয়স এখন ৫৫ বছর হবে। ২২ বছর জেলে কাটিয়ে সম্প্রতি ফিরেছেন এলাকায়। ‘উপরে’ লাইন করেই এসেছেন।
গত তিনদিন ধরে পলাশের রামপুরা উলনের এবং ওয়াপদা রোড এলাকার বাসার আশপাশে অবস্থান নিয়ে দেখা গেছে, তিনি সতর্কতার সঙ্গে নিজস্ব পাহাড়ায় অবস্থান করছেন। কখনো এ বাসায়, কখনো অপর বাসায় স্থানান্তর হচ্ছেন। কখন কোন বাসায় রাতযাপন করছেন- তা আগে থেকে বুঝতে পারেন না সহযোগিরা।
যদিও ইউনূস সরকারের আমলে কয়েকজন আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিন নিয়ে দেশত্যাগ করলেও পলাশ চেষ্টা করেননি। কারণ হিসেবে তার ঘনিষ্ঠরা তখন বলেছিলেন- কারাগারের বাইরে পলাশের প্রচণ্ড মৃত্যুভয় রয়েছে। এ কারণে জামিন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলেও তা ফিরিয়ে কারাবন্দি থাকার প্রচেষ্টা চালান পলাশ।
পলাশের কারামুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেলেও এত গোপনে কীভাবে তিনি জামিন পেলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০০২ সালের ২৯ মে রামপুরায় যুবদলের নেতা মিজানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ মামলায় ২০০৩ সালে গ্রেপ্তার হন পলাশ। পরবর্তিতে বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। উচ্চ আদালত সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। গত ২২ বছরে বিভিন্ন কারাগারে ২৩ বারের বেশি স্থানান্তর করা হয় তাকে।
এর মধ্যেই ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে পলাশের স্ত্রী মাহমুদা মুন্সিগঞ্জ হাসপাতালে জন্ম দেন এক কন্যা সন্তানের। তার বয়স এখন ১২ বছর। মাহমুদা তখন এ প্রতিবেদককে বলেছিলেন, কারাগার থেকে আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে রামপুরার বাসায় দেখা করে যেতেন পলাশ। কখনো কয়েক ঘণ্টা, কখনো সারা দিন পরিবারের সঙ্গে থাকেন। প্রিজন ভ্যানে নয়, আসা-যাওয়া করতেন মাইক্রোবাসে করেই। বাড়ির বাইরে পাহারা দিত পুলিশ।
এ ঘটনা ফাঁস হলে তোলপাড় হয় সরকারের শীর্ষপর্যায়ে। শুরু হয় তদন্ত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই দণ্ডিত অপরাধীকে আদালতে আনা-নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ৩০৫ জন কারা ও পুলিশ সদস্যের সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়।
গোয়েন্দা নথি বলছে, দেশের যে কারাগারেই পলাশকে পাঠানো হতো- তিনি তদবির করে ঢাকা বা আশপাশে চলে আসতেন। কারাগারের একটি সিন্ডিকেটকে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা দিতেন তিনি, যা চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ। বিনিময়ে কারাগারে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, এসি, ফ্রিস, টেলিভিশনসহ সব ধরনের বিলাসি সুযোগসুবিধা গ্রহণ করতেন হরহামেশা।
রামপুরা থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেছিলেন, এলাকার ভুক্তভোগী লোকজন বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেন, পলাশ ও তুষারের (পলাশের বোনের ছেলে, বর্তমানে কারাগারে) নামে তাদের কাছে চাঁদা চাওয়া হচ্ছে। রেকর্ড বিশ্লেষণ করে কারাগারে থেকেও অনেক সিম ব্যবহারের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। পলাশের বিরুদ্ধে এমনও অভিযোগ রয়েছে, তিনি হাতকড়া পরা অবস্থায় এলাকায় এসে গুলি চালিয়েছেন।
ভিওডি বাংলা/আরআর/এসআর







